রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬ | ৭ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ৯ রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ | সন্ধ্যা ৭:২৭:৪৪

ব্রিটেনে সন্ত্রাসবাদবিরোধী আইন ও শ্বেতাঙ্গ বিশেষাধিকার: ফিলিস্তিন সংহতির নতুন লড়াই

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬, ৬:১৯
শেয়ার: mail
ব্রিটেনে সন্ত্রাসবাদবিরোধী আইন ও শ্বেতাঙ্গ বিশেষাধিকার: ফিলিস্তিন সংহতির নতুন লড়াই

কাল প্রকাশ। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাজ্যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে অসমভাবে প্রয়োগ করা সন্ত্রাসবাদবিরোধী আইনের মুখোমুখি হয়ে এবার শ্বেতাঙ্গ বিক্ষোভকারীরা এমন এক বৈষম্যমূলক আইনি ব্যবস্থার মুখোশ উন্মোচন করছেন, যা এতদিন তথাকথিত ‘চেনা সন্দেহভাজনদের’ ওপর চাপিয়ে দেওয়া ছিল অত্যন্ত সহজ।

সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়—একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ শিক্ষাবিদ সাধারণ একটি ঘরের বইয়ের তাকের সামনে বসে ধীর-স্থির কণ্ঠে কথা বলছেন। তিনি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে এমন বক্তব্য দিচ্ছেন, যা বর্তমান ব্রিটিশ আইনে অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। তিনি খুব স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘আমি গণহত্যার বিরোধিতা করি, আমি ফিলিস্তিন অ্যাকশনকে সমর্থন করি।’

তিনি একা নন; ব্যাপক নাগরিক অসহযোগ আন্দোলনের সমন্বয়কারী সংগঠন ‘ডিফেন্ড আওয়ার জুরিস’-এর মতে, ইতোমধ্যে ৬০ জনেরও বেশি মানুষ নিজেদের এমন ভিডিও ধারণ করেছেন। পার্লামেন্ট স্কয়ারে প্ল্যাকার্ড প্রদর্শনের পর্যায় পেরিয়ে আন্দোলনটি এখন সন্ত্রাসবাদ দমন আইন ‘টেরর অ্যাক্ট ২০০০’-এর সেকশন-১২-এর আওতায় পৌঁছেছে, যেখানে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। ইতোমধ্যে আন্দোলনকারীদের বাড়িঘরে সন্ত্রাসবিরোধী পুলিশ অভিযান ও তল্লাশি চালিয়েছে। তবে সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো—এই প্রতিবাদকারীদের প্রায় সবাই শ্বেতাঙ্গ।

নির্দোষ বলে ধরে নেওয়ার সুবিধা ও শ্বেতাঙ্গ বিশেষাধিকার: গত আড়াই দশক ধরে ‘টেররিজম অ্যাক্ট ২০০০’ ব্রিটিশ মুসলিম সম্প্রদায়ের সাধারণ জীবনকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে। হিথ্রো বিমানবন্দরে শিডিউল ৭-এর আওতায় সুনির্দিষ্ট সন্দেহ ছাড়াই তল্লাশি, ‘প্রিভেন্ট’ কর্মসূচির মাধ্যমে শিশুদের ওপর নজরদারি, বিনা কারণে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বন্ধ কিংবা দীর্ঘ সময় বেলমার্শ কারাগারে আটকে রাখার ঘটনা মুসলিমদের জন্য নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা। মানবাধিকার সংস্থা কেজ ইন্টারন্যাশনালের (CAGE) তথ্য অনুযায়ী, শিডিউল ৭ তল্লাশিতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের অনুপাত প্রায় ১৫০:১।

কাউন্টার-টেররিজম ব্যবস্থায় শ্বেতাঙ্গ বিশেষাধিকার মানে কোনো কষ্টহীন জীবন নয়; বরং পুলিশের মুখোমুখি হওয়ার পরও প্রাথমিক দৃষ্টিতে ‘নির্দোষ’ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার সুবিধা। একই আইন ও একই হাতকড়া—অথচ একজন শ্বেতাঙ্গ বৃদ্ধ পার্লামেন্ট স্কয়ারে গ্রেপ্তার হলে দেশ তাকে দেখে রাষ্ট্রের অযৌক্তিক আইনের প্রতীক হিসেবে, আর একজন মুসলিম গ্রেপ্তার হলে তাকে দেখা হয় সহজাত সন্দেহভাজন হিসেবে। আন্দোলনকারীরা সেই শ্বেতাঙ্গ বিশেষাধিকারকে গাজায় চলমান গণহত্যা ও ব্রিটিশ সরকারের সংশ্লিষ্টতার বিরুদ্ধে জবাবদিহি আদায়ের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন।

‘চেনা সন্দেহভাজন’ এবং সমঝোতার ফাঁদ: সংবাদমাধ্যমে বলা হচ্ছে—এই বিক্ষোভকারীরা কোনো ‘চেনা সন্দেহভাজন’ নন; তাঁরা সম্মানিত শিক্ষক, ধর্মযাজক বা প্রবীণ নাগরিক। কিন্তু এই ভাষার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে এক বিপজ্জনক স্বীকারোক্তি। এর অর্থ দাঁড়ায়, এতদিন যাদের ওপর এই আইন প্রয়োগ করা হয়েছে, তা যেন ন্যায়সঙ্গত ছিল। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মাধ্যমে নিপীড়নের এই শ্রেণিবিন্যাস মেনে নেওয়া উচিত নয়। এমনকি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বা লিবার্টির মতো সংস্থাগুলোও আইনটি পুরোপুরি বাতিলের বদলে কেবল কিছুটা শিথিল করার দাবি তুলছে।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্রিটিশ হাইকোর্ট ফিলিস্তিন অ্যাকশনকে নিষিদ্ধ করার সরকারি সিদ্ধান্তকে বেআইনি ঘোষণা করেছিল; তবে জুন মাসে কোর্ট অব আপিল তা পুনর্বহাল করে এবং সুপ্রিম কোর্ট এ বিষয়ে চূড়ান্ত আপিল শুনানিতে সম্মত হয়েছে।

একটি রাষ্ট্র যখন কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে একটি নিপীড়নমূলক আইন তৈরি করে এবং পরবর্তীতে তা বৃহত্তর জনগণের ওপরও প্রয়োগ হতে শুরু করে, তখন রাষ্ট্র সহজে স্বীকার করতে চায় না যে আইনটি শুরু থেকেই ত্রুটিপূর্ণ ছিল। ফলে কেবল প্রতীকী গ্রেপ্তারেই আন্দোলনের সার্থকতা সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। সংগ্রাম ততক্ষণ চালিয়ে যেতে হবে, যতক্ষণ না অধিকৃত ফিলিস্তিনে গণহত্যা ও বর্ণবাদী কাঠামোর অবসান ঘটে এবং সকল নাগরিকের ওপর সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অন্যায় নজরদারির সমাপ্তি হয়।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

kalprakash.com/IM

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সব দেখুন arrow_forward
Logo
রোববার, ২৩ আগস্ট ২০২৬ | Globe kalprakash.com

ব্রিটেনে সন্ত্রাসবাদবিরোধী আইন ও শ্বেতাঙ্গ বিশেষাধিকার: ফিলিস্তিন সংহতির নতুন লড়াই

বিস্তারিত কমেন্টে