চার বছর আগে মৃত্যুর দুয়ার থেকে সন্তানকে ফিরিয়ে আনতে নিজের একটি কিডনি দান করেছিলেন মা বুলি বেগম। মায়ের সেই মহান আত্মত্যাগে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখেছিলেন ২৪ বছর বয়সী তরুণ জাহিদ হাসান। রোগকে জয় করে ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন, শুরু করেছিলেন কর্মজীবন—যোগ দিয়েছিলেন শিক্ষকতায়। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। মায়ের দেওয়া সেই কিডনিটিও বিকল হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি। সন্তানকে হারিয়ে মায়ের কান্না ও আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পঞ্চগড়ের বাতাস।
জাহিদ হাসানের বাড়ি পঞ্চগড় সদর উপজেলার ঠেকরপাড়া গ্রামে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করে এনটিআরসিএর সুপারিশে সম্প্রতি একটি মাদ্রাসায় সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন তিনি।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালের অক্টোবরে জাহিদের দুটি কিডনিই বিকল হয়ে পড়ে। সন্তানের এমন সংকটে বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে ২০২২ সালের ২২ জানুয়ারি ঢাকার শ্যামলীর একটি হাসপাতালে মা বুলি বেগম নিজের একটি কিডনি সন্তানকে দান করেন। সফল কিডনি প্রতিস্থাপনের পর সুস্থ হয়ে ওঠেন জাহিদ এবং কর্মজীবনে ফেরেন। তবে সম্প্রতি আবারও তার শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটে এবং প্রতিস্থাপিত কিডনিটিও কাজ করা বন্ধ করে দেয়।
মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও বাঁচতে চেয়ে আকুতি জানিয়েছিলেন জাহিদ। মৃত্যুর আগের দিন সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি আবেগঘন পোস্ট দেন তিনি। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, ‘কাল সকাল ৭টায় উন্নত চিকিৎসা করতে ঢাকায় যাব। যদি ওই পর্যন্ত টিকে থাকি। আমি নিঃস্ব, কাঙাল। যা পারেন তাই দিয়ে হেল্প করেন… আমি অন্তিম মুহূর্তে এখন।’
কিন্তু ঢাকায় পৌঁছে উন্নত চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ আর পাননি তিনি। তার আগেই মৃত্যুর কাছে হার মানেন জাহিদ।
জাহিদের এই অকালপ্রয়াণে পরিবার ও পুরো এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। এর আগেও জাহিদের জীবন ছিল নানা কষ্টে ঘেরা। ২০০৪ সালে ব্লাড ক্যানসারে ছোট বোন এবং একই বছর সড়ক দুর্ঘটনায় বাসচালক বাবাকে হারান তিনি। চরম অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা জাহিদকে বাঁচাতে পরিবার তাদের অবশিষ্ট ভিটেমাটিও বিক্রি করে দিয়েছিল।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মাহাতাব প্রধান মারিফ শোক প্রকাশ করে বলেন, ছেলেটি অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা শেষ করে শিক্ষক হয়েছিল। মায়ের কিডনি পেয়ে সুস্থ হওয়ার পর ভেবেছিলাম, পরিবারটির দুঃখ হয়তো এবার ঘুচবে। কিন্তু এত অল্প বয়সে তার এভাবে চলে যাওয়া সত্যিই মেনে নেওয়া কঠিন।
মায়ের দেওয়া জীবনের আলো শেষ পর্যন্ত নিভে গেল। পেছনে রয়ে গেল এক মায়ের বুকভরা কান্না আর সন্তানের শেষ না হওয়া স্মৃতি।