বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬ | ৪ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ৬ রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ | রাত ১১:০১:২৪

নাট্যমঞ্চ থেকে বঙ্গভবনের পথে: মির্জা ফখরুলের পাঁচ দশকের বর্ণাঢ্য মহাকাব্য

মোস্তাফিজুর রহমান আকাশ, রুহিয়া (ঠাকুরগাঁও) প্রতিনিধি
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬, ১১:১৯
শেয়ার: mail
নাট্যমঞ্চ থেকে বঙ্গভবনের পথে: মির্জা ফখরুলের পাঁচ দশকের বর্ণাঢ্য মহাকাব্য

কাল প্রকাশ। ছবি: সংগৃহীত

একসময় নাট্যমঞ্চের কুশীলব হয়ে নিয়মিত অংশ নিতেন বর্ণিল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে। ছাত্রজীবনের উত্তাল দিনগুলোতে রাজপথেও ছিলেন সমানভাবে সরব। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে শ্রেণিকক্ষের প্রিয় অধ্যাপক, পৌরসভার সফল চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী ও দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপির কাণ্ডারি ও মহাসচিব। জীবনের প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে বর্ষীয়ান রাজনীতিক মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবার দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতির আসনে আসীন হওয়ার দ্বারপ্রান্তে।

দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়েছেন তিনি। আইনি ও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া বাকি থাকলেও ঠাকুরগাঁওয়ের এই কৃতি সন্তানকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে পাওয়া নিয়ে এখন দেশজুড়ে রাজনৈতিক মহলে চলছে ব্যাপক আলোচনা ও উচ্ছ্বাস।

মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ জীবন কেবল প্রথাগত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেই সীমাবদ্ধ নয়। সংস্কৃতি ও নাট্যচর্চা, শিক্ষাদানের মহান ব্রত এবং রাজপথের আপসহীন আন্দোলন—সবকিছুই মিলেমিশে তৈরি করেছে তাঁর অনন্য এক ব্যক্তিত্ব। নাট্যমঞ্চ ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের সেই মার্জিত চেতনা রাজনীতির জটিল ও সংঘাতপূর্ণ অঙ্গনেও তাঁকে একজন পরিচ্ছন্ন, ধীরস্থির ও সংস্কৃতিমনস্ক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ের এক সম্ভ্রান্ত রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম নেন মির্জা ফখরুল। তাঁর বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন খ্যাতিমান আইনজীবী ও সাবেক সংসদ সদস্য। ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের এসএম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হিসেবে সক্রিয় ছাত্ররাজনীতিতে নেতৃত্ব দেন।

পড়াশোনা শেষে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়ে ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন সরকারি কলেজে দীর্ঘ সময় সফলভাবে অধ্যাপনা করেন। ১৯৭৯ সালে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে ১৯৮৬ সালে শিক্ষকতা থেকে পদত্যাগ করে সরাসরি সক্রিয় রাজনীতিতে নামেন। ১৯৮৮ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি।

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পেয়ে দলকে তৃণমূল পর্যায়ে সুসংগঠিত করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক নিষ্ঠা ও অপেক্ষার পর ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে প্রথমবার বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তৎকালীন সরকারে তিনি কৃষি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দক্ষতার সাথে পালন করেন।

২০১১ সালে খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং ২০১৬ সালের কাউন্সিলে তিনি পূর্ণ মহাসচিব হিসেবে নির্বাচিত হন। বিগত দেড় দশকের কঠিন সময়ে হামলা, মামলা ও কারাভোগের মুখেও তিনি বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে রাজপথে আপসহীন কাণ্ডারির ভূমিকা পালন করেন।

ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর পরিবারও রাজনীতি ও সমাজসেবায় সুপরিচিত। তাঁর এক চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার ও আইনমন্ত্রী এবং আরেক চাচা উইং কমান্ডার এস আর মির্জা ছিলেন ঐতিহাসিক মুজিবনগর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব।

নাট্যমঞ্চের তরুণ অভিনেতা থেকে শুরু করে শিক্ষকের শ্রেণিকক্ষ, পৌরসভার মেয়রের চেয়ার, রাজপথের সংগ্রাম ও জাতীয় সংসদ পেরিয়ে আজ বঙ্গভবনের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রপ্রধানের পথে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর—যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য অনুপ্রেরণাদায়ী দৃষ্টান্ত।

kalprakash.com/IM

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সব দেখুন arrow_forward
Logo
শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬ | Globe kalprakash.com

নাট্যমঞ্চ থেকে বঙ্গভবনের পথে: মির্জা ফখরুলের পাঁচ দশকের বর্ণাঢ্য মহাকাব্য

বিস্তারিত কমেন্টে