বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬ | ২০ শ্রাবণ, ১৪৩৩ | ২০ সফর, ১৪৪৮ | রাত ৮:৩৩:০৯

হরমুজ সংকটে বদলে যাচ্ছে বৈশ্বিক এলএনজি বাজারের সমীকরণ

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ৭:০৭
শেয়ার: mail
হরমুজ সংকটে বদলে যাচ্ছে বৈশ্বিক এলএনজি বাজারের সমীকরণ

কাল প্রকাশ। ছবি: সংগৃহীত

ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘ পাঁচ মাস ধরে চলে আসা অস্থিরতা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে এক চরম পরিবর্তন ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। শুরুতেই আলোচনা কেবল এলএনজির (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) সরবরাহ ব্যাহত হওয়া নিয়ে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন জ্বালানি বিশ্লেষকরা আরও বড় ঝুঁকি দেখছেন। তাদের মতে, সরবরাহ সংকটের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির সার্বিক চাহিদার সমীকরণও আশঙ্কাজনকভাবে বদলাতে শুরু করেছে।

এখনও অনিশ্চয়তায় হরমুজ প্রণালি: সংকটের পাঁচ মাস পার হলেও সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—হরমুজ প্রণালি দিয়ে এলএনজিবাহী জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হবে কবে? গত মার্চে কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান ‘কাতারএনার্জি’ অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি উল্লেখ করে ‘ফোর্স ম্যাজিউর’ ঘোষণা করলে এক ধাক্কায় বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ এলএনজি সরবরাহ অনিশ্চয়তার কবলে পড়ে।

সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত কিছুটা কমলেও এবং অপরিশোধিত তেলের বাজার যুদ্ধজনিত অতিরিক্ত দাম (ওয়ার প্রিমিয়াম) থেকে খানিকটা নামলেও এলএনজির বাস্তব সরবরাহে কোনো উন্নতি দেখা যায়নি। গত ২৯ জুলাই কাতারএনার্জির ‘আল আরিশ’ নামের একটি জাহাজ দীর্ঘ দিন পর প্রথম হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করলেও কাতারএনার্জি ‘ফোর্স ম্যাজিউর’-এর মেয়াদ আগামী অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাড়িয়েছে। এর ফলে এশিয়ার স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। জানুয়ারিতে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) এলএনজির দাম যেখানে ছিল ১০ ডলার, জুলাইয়ে তা লাফিয়ে ২০ থেকে ২২ ডলারে ঠেকেছে।

সরবরাহের পাশাপাশি বদলাচ্ছে চাহিদার চিত্র: আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে জুনের মধ্যে উত্তর আমেরিকা ও আফ্রিকার নতুন উৎপাদন বাড়িয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের হারিয়ে যাওয়া সরবরাহের প্রায় ৭৫ শতাংশ ঘাটতি মেটানো গেছে। কিন্তু বাকি ২৫ শতাংশের কোনো বিকল্প ছিল না। ফলে স্পষ্ট হয়েছে যে, বিশ্ব এলএনজি সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ এখনও মাত্র ২১ মাইল প্রশস্ত হরমুজ প্রণালির ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার ওপর সম্পূর্ণ জিম্মি।

এই টানাপোড়েন দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক চাহিদায় বড় ধাক্কা দিচ্ছে। অস্থিতিশীল দাম ও সরবরাহ অনিশ্চয়তার কারণে আমদানিকারক দেশগুলো দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্থানীয় উৎপাদন, ব্যাটারি স্টোরেজ এবং ক্ষেত্রবিশেষে কয়লার ব্যবহারের দিকে ঝুকছে।

সংকোচনের মুখে বৈশ্বিক বাজার: জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘গ্যাস স্ট্র্যাটেজিস’-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আরব উপসাগর থেকে রফতানি সীমিত থাকলে ২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে বৈশ্বিক এলএনজির চাহিদা অন্তত ৮ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।

এদিকে বহুজাতিক জ্বালানি প্রতিষ্ঠান ‘শেল’-এর পূর্বাভাসে সতর্ক করে বলা হয়েছে, চলতি মৌসুমে নৌপথের সংকট দূর না হলে ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক এলএনজি বাণিজ্যে প্রবৃদ্ধি তো হবেই না, বরং তা বার্ষিক সংকোচনের মুখোমুখি হতে পারে। ফলে এক দশকেরও বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো স্থবির হয়ে পড়তে পারে এলএনজি বাজারের প্রবৃদ্ধির চাকা।

নতুন উৎপাদনের প্লাবন ও ক্রেতা সংকট: একদিকে চাহিদা কমার আতঙ্ক, অন্যদিকে বাজারে আসছে নতুন উৎপাদনের জোয়ার। নির্মাণাধীন প্রকল্পগুলো চালুর মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে নতুন করে বছরে প্রায় ২০ কোটি ৭০ লাখ টন এলএনজি উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত হতে যাচ্ছে, যা বর্তমান বিশ্ব বাণিজ্যের (৪২ কোটি ২০ লাখ টন) প্রায় অর্ধেক। ফলে আগামী দিনে প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—উৎপাদন নয়, বরং উৎপাদিত গ্যাস কেনার মতো পর্যাপ্ত ক্রেতা বিশ্ববাজারে মিলবে তো?

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির এই সংকট স্রেফ একটি কৌশলগত সমুদ্রপথ বন্ধের সমস্যা নয়; এটি বৈশ্বিক এলএনজি শিল্পের মূল ভিত্তিকেই কাঁপিয়ে দিয়েছে। আগামী দিনের এলএনজি বাজারে প্রতিযোগিতা কেবল গ্যাসের উৎপাদন বা দাম দিয়ে নির্ধারিত হবে না, বরং অনিশ্চয়তার মুখে ক্রেতাদের সরবরাহ ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতার আস্থা দেওয়াই হবে সবচেয়ে বড় শক্তি। (সূত্র: দ্য ন্যাশনাল নিউজ)

kalprakash.com/IM

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সব দেখুন arrow_forward