জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কোনো অংশেই ফরাসি বিপ্লবের চেয়ে কম নয় বলে মন্তব্য করেছেন রাকসুর সাবেক ভিপি ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, জুলাই একটি তাৎপর্যপূর্ণ গণ-অভ্যুত্থান বা বিপ্লব। ফরাসি বিপ্লবও ছিল নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার বিপ্লব।
রোববার (২ আগস্ট) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে শাখা ছাত্রদল আয়োজিত ‘রক্তাক্ত জুলাই স্মরণ ও প্রত্যয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
রিজভী বলেন, ফরাসি বিপ্লব ছিল সামন্ত শ্রেণির বিরুদ্ধে বুর্জোয়া শ্রেণির সংগ্রাম। সেটিও ছিল অধিকার রক্ষার সংগ্রাম। প্রতিটি বিপ্লব বা গণ-অভ্যুত্থানেই রক্ত ঝরে। কিন্তু এই জুলাই বিপ্লবে এক মাসে যত রক্ত ঝরেছে, তা ফরাসি বিপ্লব বা পৃথিবীর অন্য কোনো বিপ্লবে এক মাসে ঝরেছে কিনা সন্দেহ আছে।
বিএনপির এই সিনিয়র নেতা বলেন, গ্রামের পর গ্রাম, শহরের পর শহর—প্রতিদিন রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে তরুণদের লাশ পড়েছে। স্কুল, কলেজ, সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দমন-পীড়নের শিকার হয়েছে। শেখ হাসিনার সরকার আইনশৃঙ্খলার নামে একের পর এক শৃঙ্খল চাপিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সেই শৃঙ্খল বারবার ভেঙে তরুণরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, নাগরিক স্বাধীনতা এবং মানুষের বাকস্বাধীনতা ফিরিয়ে আনার লড়াই করেছে। তাঁদের এই আত্মত্যাগ সত্যিই মহিমান্বিত।
তিনি আরও বলেন, শেখ হাসিনা এতটাই ঘৃণ্য এক শাসক ছিলেন যে নিজের দেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্তানদের হত্যা করতেও দ্বিধা করেননি। আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর অনেককে ডেকে তিনি বলতেন, আমার সোনার হরিণ চাই! সেই সোনার হরিণ ছিল তাঁর ক্ষমতা, আর সেই ক্ষমতা ধরে রাখার জন্যই ছিল তাঁর এতসব চেষ্টা।
ছাত্র-জনতার সাহসিকতার বর্ণনা দিয়ে রিজভী বলেন, তিনি মনে করেছিলেন এভাবে গুলি করে, মানুষ হত্যা করে, রক্তগঙ্গা বইয়ে দিয়ে তাঁর ময়ূরের সিংহাসন রক্ষা করবেন। কিন্তু তিনি এই জাতির ইতিহাস এবং তার ভেতরের অদম্য সাহসের শক্তি পরিমাপ করতে পারেননি। শেখ হাসিনা তা পরিমাপ করতে পারেননি বলেই র্যাবের হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানো সত্ত্বেও মিছিল নির্ভয়ে সামনে এগিয়ে গেছে। ডানে, বামে, সামনে, পেছনে, এমনকি আকাশ থেকেও বর্ষিত হচ্ছিল গুলি; তবুও সব রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দুর্দম বেগে সামনে এগিয়ে গেছে এই বীর জনতা।
আলোচনা সভায় প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির বলেন, ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন এমন অনেকে, যাঁদের গত ১৭ বছরে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন বা শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবির পক্ষে কোনো দৃশ্যমান ভূমিকা ছিল না। পরবর্তীতে তাঁরা দায়িত্ব পেয়ে নিজেদের একটি গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়া শুরু করেন।
তিনি আরও বলেন, আজ যখন গণতান্ত্রিক পরিবেশে দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত শিক্ষকদের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, তখন কেউ কেউ এটিকে দলীয় বিবেচনার নিয়োগ বলে প্রচার করছেন। যারা এমন বয়ান তৈরি করছেন, তারাই গোপন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করছেন এবং প্রকাশ্য রাজনীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাইছেন।
সভাপতির বক্তব্যে শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান ছিল বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গড়ার আন্দোলন। সেই আন্দোলনে অসংখ্য মানুষ জীবন দিয়েছেন, আহত হয়েছেন। কিন্তু আজও প্রশ্ন করতে হয়—সেই আত্মত্যাগের প্রকৃত মূল্যায়ন কি হয়েছে?
রাহী বলেন, যাঁরা জুলাই-আগস্টে বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন, আজ তাঁদের অনেকেই কর্মসংস্থানহীন। তাঁদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে এবং ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। তখনই জুলাই-আগস্টের আত্মত্যাগের প্রকৃত মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে এবং আন্দোলনের লক্ষ্য পূরণ হবে; অন্যথায় বাংলাদেশ পিছিয়েই থাকবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আজও বিভিন্ন ষড়যন্ত্র চলছে। কেউ পাকিস্তানি ভাবধারা ধারণ করে, কেউ ভারতের আধিপত্যবাদকে ধারণ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী যে কোনো ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ ঐক্যবদ্ধ।
শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক সরদার জহুরুলের সঞ্চালনায় সভায় অন্যদের মধ্যে রাবি উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটনসহ জেলা, মহানগর বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের বিভিন্ন নেতা বক্তব্য দেন। এ সময় দলীয় বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
kalprakash.com/IM