জন্মের দুই বছর বয়সেই বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ। এরপর দাদির স্নেহ-ছায়ায় বেড়ে ওঠা। শৈশব থেকেই পারিবারিক সংকট ও নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে তাঁকে। বিয়ের পর কাঁধে চেপেছে সংসারের দায়িত্ব। এমনকি অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায়ও থেমে থাকেনি পড়াশোনা। সব বাধা পেরিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ অর্জন করে সাফল্যের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন পাবনার চাটমোহর উপজেলার আঁখি খাতুন। হয়েছেন উপজেলার সেরা শিক্ষার্থী।
আঁখি খাতুন চাটমোহর উপজেলার ছাইকোলা গ্রামের আকমল হোসেন ও মধু খাতুন দম্পতির সন্তান। জন্মের মাত্র দুই বছর বয়সে বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হলে তাঁর জীবনে নেমে আসে নানা প্রতিকূলতা। পরে বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করলে দাদির তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠেন তিনি। মানসিক প্রতিবন্ধী মায়ের একমাত্র সন্তান আঁখিকে শৈশব থেকেই নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবে প্রতিকূল পরিস্থিতির কাছে হার মানেননি তিনি। বরং শিক্ষার প্রতি গভীর আগ্রহ ও অদম্য ইচ্ছাশক্তি নিয়ে এগিয়ে গেছেন নিজের লক্ষ্যের দিকে।
পড়াশোনায় বরাবরই মেধাবী আঁখি এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১১৭৫ নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হন। এরপর ভর্তি হন ছাইকোলা ডিগ্রি কলেজে। কলেজজীবনে ভালোবেসে বিয়ে করে শুরু করেন সংসারজীবন। তবে সংসারের দায়িত্ব তাঁর শিক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। স্বামী ও শ্বশুর-শাশুড়ির অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতায় সংসারের কাজ সামলে চালিয়ে যান পড়াশোনা। এমনকি অন্তঃসত্ত্বা অবস্থাতেও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নেন তিনি।
অবশেষে তাঁর সেই পরিশ্রমের স্বীকৃতি মিলেছে পরীক্ষার ফলে। মানবিক বিভাগ থেকে ১০৯১ নম্বর পেয়ে জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন আঁখি। তাঁর এ সাফল্যে পরিবার, শিক্ষক ও এলাকাবাসীর মধ্যে আনন্দের সৃষ্টি হয়েছে।
তবে এখানেই থেমে থাকতে চান না আঁখি। ভবিষ্যতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে উচ্চশিক্ষা অর্জন করতে চান তিনি। তাঁর প্রথম পছন্দ বিচার বিভাগে কাজ করা। পাশাপাশি বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দিয়ে দেশ ও মানুষের সেবা করার স্বপ্নও রয়েছে তাঁর। সেই স্বপ্ন পূরণে সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন এই মেধাবী শিক্ষার্থী।
নিজের সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান দাদির বলে জানিয়েছেন আঁখি। তিনি বলেন, মা-বাবা, স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি ও শিক্ষকদের কাছ থেকেও সবসময় উৎসাহ ও সহযোগিতা পেয়েছেন। তাঁদের অনুপ্রেরণাই তাঁকে প্রতিকূলতার মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে। আগামীর স্বপ্ন পূরণেও সবার দোয়া কামনা করেন তিনি।
আঁখির সাফল্যে গর্বিত তাঁর শাশুড়ি রওশনারা খাতুন। তিনি বলেন, তাঁর বউমা অত্যন্ত পরিশ্রমী। সংসারের সব দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি প্রতিদিন নিয়মিত সাত থেকে আট ঘণ্টা পড়াশোনা করেছেন। ভবিষ্যতেও আঁখির পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পরিবারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
ছাইকোলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মো. সাইফুল ইসলাম জানান, সদ্য প্রকাশিত উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলে সার্বিক ফল বিপর্যয়ের মধ্যেও তাঁর কলেজ উপজেলায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে। কলেজ থেকে আঁখি খাতুন, উম্মুল খাইর সাফিয়া ও মোছা. তামিম সরকারসহ মোট তিনজন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন। এ অর্জনে তাঁরা আনন্দিত ও গর্বিত।
আঁখির এই অর্জনে গর্বিত ছাইকোলা ডিগ্রি কলেজের গভর্নিং বডি, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী। তাঁদের প্রত্যাশা, আঁখির এই সাফল্য শুধু তাঁর পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করবে না, বরং প্রতিকূলতার মধ্যেও স্বপ্ন দেখা ও তা বাস্তবায়নে এলাকার অন্য শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণা জোগাবে।