ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) দীর্ঘ ১০ থেকে ২০ বছর ধরে কর্মরত ২৬৮ জন অস্থায়ী কর্মচারীর বেতন বন্ধ রয়েছে। টানা তিন মাস বেতন না পেয়ে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন তাঁরা। পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন অনেকেই। একই সঙ্গে চাকরি হারানোর শঙ্কাও তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) নির্দেশনা ও সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাঁদের বেতন বন্ধ করা হয়েছে। তবে কর্মচারীদের অভিযোগ, একই ধরনের নির্দেশনা আগেও থাকলেও বিগত প্রশাসনগুলো বেতন বন্ধ করেনি।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে ২৬৮ জন অস্থায়ী কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৬২ জন থোক বরাদ্দে এবং প্রায় ২০০ জন দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে নিয়োজিত। তাঁদের অনেকেই পোষ্য কোটায় নিয়োগ পেয়েছেন। এসব কর্মচারীর পেছনে প্রতি মাসে প্রায় ২১ লাখ টাকা ব্যয় হয়। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিন্ডিকেটের অনুমোদনে নন-টেকনিক্যাল কর্মচারীদের মাসিক বেতন ১০ হাজার এবং টেকনিক্যাল কর্মচারীদের ১১ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়।
বিভিন্ন সময়ে বেতন বৃদ্ধি ও চাকরি স্থায়ীকরণের দাবিতে উপাচার্যের কার্যালয় ঘেরাও, অবস্থান কর্মসূচি ও মানববন্ধন করেছেন কর্মচারীরা। এ ছাড়া ৫৬ জন কর্মচারী চাকরি স্থায়ীকরণের দাবিতে হাইকোর্টে রিট করেছেন। তাঁদের দাবি, পোষ্য কোটায় নিয়োগ পাওয়া কর্মচারীদের স্থায়ী করার বিধান থাকলেও দীর্ঘদিনে তাঁদের চাকরি স্থায়ী করা হয়নি।
কর্মচারীদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের ১৯৬তম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কোনো কর্মচারী কর্মরত অবস্থায় মারা গেলে তাঁর স্ত্রী বা সন্তানদের যোগ্যতা অনুযায়ী জরুরি ভিত্তিতে স্থায়ী নিয়োগ দেওয়ার কথা রয়েছে। ১৯৯৬ সালের দিকে একই প্রক্রিয়ায় দুজনকে স্থায়ী নিয়োগও দেওয়া হয়েছিল। তবে বর্তমানে তাঁদের ক্ষেত্রে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ তাঁদের।
এদিকে ২০২০ সালে ইউজিসির এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২০১৮-২০১৯ অর্থবছর পর্যন্ত এডহক, মাস্টাররোল ও দৈনিক ভিত্তিতে কর্মরতদের বেতন বরাদ্দ অব্যাহত রাখা হবে। তবে ২০১৯-২০২০ অর্থবছর থেকে কমিশনের পূর্বানুমোদন ছাড়া নিয়োগ পাওয়া কর্মচারীদের জন্য কোনো অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হবে না। কর্মচারীদের দাবি, এমন নির্দেশনা আগেও থাকলেও কোনো প্রশাসন তাঁদের বেতন বন্ধ করেনি।
সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২৬৮ জন অস্থায়ী কর্মচারীর জন্য নতুন করে অর্থ বরাদ্দ না দেওয়া এবং তাঁদের আর না রাখার বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছে ইউজিসি। সংস্থাটির চিঠির ভিত্তিতে সর্বশেষ সিন্ডিকেট সভায় তাঁদের বেতন বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাশাপাশি জনবল সংকটের বিষয়ে নতুন করে নোট দিতে বলা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও দপ্তর চাইলে এসব কর্মচারীকে কাজে রাখতে পারবে। সে ক্ষেত্রে তাঁদের বেতনের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা দপ্তরকে নিতে হবে।
কর্মচারী ইমতিয়াজ আহমেদ অন্তু বলেন, ‘সবার অন্য কোথাও চাকরি করার মতো অবস্থাও আমাদের নেই। পরিবার নিয়ে আত্মহত্যা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই। তৎকালীন নীতিমালা অনুযায়ী সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তে পোষ্য কোটায় আমাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তখন বলা হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে চাকরি স্থায়ী করা হবে। কিন্তু এখন সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তের দোহাই দিয়ে আমাদের বাদ দেওয়া হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০ থেকে ২০ বছর কাজ করার পর হঠাৎ ছাঁটাই করা হচ্ছে। আমরা এখন কোথায় যাব, কী করব, কী পরিচয় দেব? মূলত আমাদের জায়গায় নতুন লোক নিয়োগ দেওয়ার জন্যই আমাদের বাদ দেওয়া হচ্ছে। সার্কুলারের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হবে। সেখানে টাকার লেনদেন হবে বলে আমাদের আশঙ্কা। ইউজিসির ছাঁটাইসংক্রান্ত নির্দেশনার অজুহাত দেওয়া হচ্ছে। অথচ প্রতিবছরই ইউজিসি এ ধরনের চিঠি দেয়। বিগত প্রশাসনগুলো তো আমাদের বাদ দেয়নি।’
এ বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান বলেন, ‘ইউজিসি টাকা দিচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব তহবিল থেকে টাকা দিতে হচ্ছে। এ কারণে বকেয়া তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় নিজে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। ইউজিসির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রতি মাসে প্রায় ২১ লাখ টাকা প্রয়োজন হচ্ছে। এই টাকার উৎস কোথায়? আমি কীভাবে এই ব্যয় নির্বাহ করব?’