আমাদের সমাজে ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিমণ্ডলে ইদানীং এক অদ্ভুত ও ভয়ংকর শ্রেণির মানুষের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। বাহ্যিকভাবে তাদের দেখলে মনে হবে, তারা পরম ধার্মিক; নামাজ-রোজায় অত্যন্ত নিষ্ঠাবান, মুখে ও লেবাসে ধর্মের বাণী ঝরে পড়ছে। কিন্তু এই ধার্মিকতার আবরণের আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক চরম সুবিধাবাদী চরিত্র। সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, যেকোনো রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক পটপরিবর্তনে এই লোকেরাই ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সবার আগে গিরগিটির মতো রং বদলায়। আগের দিন পর্যন্ত যাদের তোষামোদি করেছে, ক্ষমতার চাকা ঘুরতেই তারা তাদের পরম শত্রু বনে যায়। নতুন ক্ষমতাধরদের মাথায় ছাতা ধরে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। স্বার্থের চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে ক্ষমতার পালাবদলের পর এরা আর মুহূর্তের জন্যও অতীতের সম্পর্কের দায় স্বীকার করে না। নিমিষেই মুছে ফেলে পুরোনো সম্পর্কের সমস্ত স্মৃতি ও দায়বদ্ধতা। এদের এই ধর্মীয় লেবাস আর তেলবাজির সমীকরণ আজ আমাদের সমাজ, কর্মক্ষেত্র ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে, যা সামগ্রিক পরিবেশকে ঠেলে দিচ্ছে এক চরম ধ্বংসের মুখে।
এই সুবিধাবাদীদের প্রধান হাতিয়ার হলো তাদের নিখুঁত দ্বিমুখী আচরণ। আড়ালে এরা সহকর্মী, সমাজের মানুষ কিংবা আড্ডার বন্ধুদের বিরুদ্ধে সুচতুর ষড়যন্ত্রের জাল বোনে, কুৎসা রটায় এবং কানকথা ছড়ায়। অথচ সামনে আসামাত্রই ধারণ করে সম্পূর্ণ বিপরীত রূপ। ক্ষমতাধর কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সামনে গেলেই তাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ওঠে; ভক্তি ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনে কোনো কমতি থাকে না। সাফল্য ও সুবিধা পাওয়ার আশায় কাকুতি-মিনতি, হাত কচলানো আর তোষামোদে তারা একাকার হয়ে যায়। নিজের সংকীর্ণ স্বার্থে ক্ষমতাধর ব্যক্তির অধীনস্থ কর্মচারীদের সামনেও নতজানু হতে তাদের বিন্দুমাত্র দ্বিধা হয় না। অথচ সেই ক্ষমতার উৎসটি চোখের আড়াল হওয়া কিংবা কোনো কারণে মসনদচ্যুত হওয়ামাত্রই তারা সেই ব্যক্তির চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করতে শুরু করে।
এদের চাটুকারিতার মাত্রা এতটাই নিচে নামতে পারে যে, ক্ষমতাবানদের তোষামোদি করতে গিয়ে কোনো নিরীহ মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ণ হলেও, এমনকি কারও সর্বনাশ হয়ে গেলেও, তাদের পাষাণ বিবেক বিন্দুমাত্র দংশিত হয় না। সমাজ ও কর্মক্ষেত্রের সচেতন মানুষ এদের এই নির্লজ্জ রূপ দেখে আড়ালে ঘৃণা প্রকাশ করেন, ছি ছি করেন; কিন্তু এদের নির্লজ্জতা ও চরম নীতিহীনতায় তার কোনো প্রভাব পড়ে না। সব ধরনের সামাজিক লোকলজ্জা বিসর্জন দিয়ে এরা কেবল ক্ষমতার অন্ধ মোহে মত্ত থাকে।
অন্যদিকে, প্রকৃত মেধাবী, সৎ ও নীতিবান সাধারণ মানুষ, সহকর্মী কিংবা সমাজের শুভাকাঙ্ক্ষীরা নৈতিকতা ও বিবেকের তাড়নায় এমন চাটুকার হয়ে উঠতে পারেন না। ফলে মেধা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তারা নানা দিক থেকে পিছিয়ে পড়েন, এমনকি একসময় একপ্রকার নির্বাসিত জীবন যাপন করতে বাধ্য হন। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, এই নীতিহীন লোকদের সাধারণ মানুষ যেমন ভয় পায়, তেমনি ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ব্যক্তিরাও অনেক সময় তাদের সমীহ করে চলেন। ফলে সর্বত্র তাদের গুরুত্ব দেওয়া হয়, বিশেষ জায়গা দেওয়া হয়, দাওয়াতে ডাকা হয় কিংবা মঞ্চের সামনের চেয়ারটি ছেড়ে দেওয়া হয়। কারণ, কে কার বিরুদ্ধে কী বদনাম করবে, কার কান ভারী করবে—এই আতঙ্কে সবাই তটস্থ থাকেন। তাছাড়া, ক্ষমতাসীনদের কাছে এরা খুব দ্রুত আপন হয়ে উঠতে পারে। কারণ, তোষামোদি ও তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে এরা সিদ্ধহস্ত।
আড্ডা, সমাজ কিংবা কর্মক্ষেত্রের যেকোনো স্তরে এই ধর্মীয় লেবাসধারী সুবিধাবাদীদের অবস্থান এক মণ দুধে এক ফোঁটা বিষের মতো। পবিত্র ও বিশুদ্ধ দুধে এক ফোঁটা বিষ মিশে গেলে যেমন তা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে, ঠিক তেমনি এরা একটি সুস্থ পরিবেশকে কলুষিত করে তোলে। ক্ষমতার প্রতি অন্ধ আনুগত্যের ভিত্তিতে এরা একটি অদৃশ্য সিন্ডিকেট বা বলয় তৈরি করে, যার ফলে যোগ্যতা ও দক্ষতার প্রাতিষ্ঠানিক এবং সামাজিক মাপকাঠিগুলো অর্থহীন হয়ে পড়ে। এই বিষাক্ত বলয়ের কারণে কর্মক্ষেত্রে তৈরি হয় এক ভয়ংকর ‘ভয়ের সংস্কৃতি’। সাধারণ কর্মীরা সর্বদা আতঙ্কে থাকেন—কখন, কার বিরুদ্ধে মনগড়া কিংবা মিথ্যা অভিযোগ তুলে নিজেদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করা হয়। ফলে মুক্তচিন্তা, সততা ও ভিন্নমতের স্বাভাবিক চর্চা বাধাগ্রস্ত হয় এবং প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হয়।
এর চেয়েও বড় ক্ষতি হয় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও কর্মক্ষেত্রে যুক্ত নবীনদের। এই সুবিধাবাদীরা যদি শিক্ষাঙ্গন কিংবা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কর্মক্ষেত্রে যুক্ত থাকেন, তাহলে ক্ষতির প্রভাব হয় আরও সুদূরপ্রসারী। দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের চরম সুবিধাবাদ, মেরুদণ্ডহীনতা ও দ্বিমুখী আচরণ দেখে তরুণ প্রজন্ম অত্যন্ত ভুল ও বিপজ্জনক বার্তা পায়। তারা শিখতে থাকে, জীবনে বড় হতে হলে মেধা, সততা কিংবা কঠোর পরিশ্রমের প্রয়োজন নেই; বরং তোষামোদি, ধর্মীয় লেবাসের প্রদর্শন এবং ক্ষমতার দালালিই সফলতার চাবিকাঠি। এর ফলে তরুণদের মধ্যে নৈতিক স্খলন ঘটে, যা একটি জাতির নৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
প্রশ্ন জাগে, এদের ধর্মীয় লেবাস ও ধর্মভিত্তিক কর্মকাণ্ড কি কেবলই লোকদেখানো, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর কোনো প্রতারণা? পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়। ইসলামে মুনাফিকির অন্যতম লক্ষণ হিসেবে মিথ্যাচার, ওয়াদাভঙ্গ ও আমানতের খেয়ানতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনের সূরা আল-বাকারার ৮-৯ নম্বর আয়াতে এমন কিছু মানুষের কথা বলা হয়েছে, যারা মুখে আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমানের দাবি করে, অথচ প্রকৃতপক্ষে মুমিন নয় এবং আল্লাহ ও মুমিনদের প্রতারিত করার চেষ্টা করে।
মুনাফিকির লক্ষণ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কথা বললে মিথ্যা বলা, ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করা এবং আমানত রাখা হলে খেয়ানত করা—মুনাফিকির লক্ষণ (সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৩)। অতএব, কেউ বাহ্যিকভাবে ধর্মীয় অনুশাসন পালন করলেও তার আচরণে যদি মিথ্যাচার, প্রতারণা, অন্যের অধিকার হরণ ও আমানতের খেয়ানত থাকে, তবে সেই আচরণ ইসলামের ন্যায়বিচার ও নৈতিকতার শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ধর্মের পরিচয় কেবল বাহ্যিক পোশাকে নয়; বরং মানুষের সততা, দায়িত্ববোধ, ন্যায়পরায়ণতা ও আচরণের মধ্যেই তার প্রকৃত প্রতিফলন ঘটে।
সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনাতেও সুবিধাবাদী ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক আচরণের ক্ষতিকর প্রভাব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়। ব্যক্তিস্বার্থে নৈতিকতা বিসর্জন দেওয়া, অন্যকে ব্যবহার করা, কৌশলে নিজের অবস্থান শক্ত করা এবং ক্ষমতাবানদের মন জুগিয়ে চলার প্রবণতা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্ষতিকর। এ ধরনের মানুষের কাছে ধর্মীয় লেবাস অনেক সময় সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন কিংবা নিজের প্রকৃত উদ্দেশ্য আড়াল করার উপায় হয়ে উঠতে পারে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, এরা আদর্শের চেয়ে ক্ষমতা ও ব্যক্তিস্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে নীতি ও আদর্শের পরিবর্তে আনুগত্য, তোষামোদি ও ব্যক্তিগত সম্পর্কই হয়ে ওঠে তাদের সাফল্যের প্রধান হাতিয়ার।
দুনিয়ার সাময়িক সুবিধা কিংবা ক্ষমতার মধু এরা উপভোগ করতে পারলেও নৈতিক বিচারে তাদের আচরণ কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। পবিত্র কোরআনের সূরা আন-নিসার ১৪৫ নম্বর আয়াতে মুনাফিকদের পরিণতি সম্পর্কে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারিত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, মুনাফিকরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে থাকবে। ধর্ম কখনো সুযোগসন্ধানী রাজনীতির হাতিয়ার কিংবা তেলবাজির ঢাল হতে পারে না। ধর্ম হলো অন্তরের সততা, নৈতিক দৃঢ়তা, দায়িত্ববোধ এবং মানুষের প্রতি ইনসাফ প্রতিষ্ঠার শিক্ষা।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরবতার প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—অন্যায় শুধু অন্যায়কারীর কর্মকাণ্ডের মাধ্যমেই টিকে থাকে না; অনেক সময় অন্যায় দেখেও যারা নীরব থাকেন, তাদের নিষ্ক্রিয়তাও অন্যায়কে শক্তিশালী করে। আলবার্ট আইনস্টাইনের নামে প্রচলিত একটি বক্তব্যে এই ভাবনাই তুলে ধরা হয়। তবে বক্তব্যটির নির্ভরযোগ্য মূল উৎস নিশ্চিত নয় বলে এটিকে তাঁর হুবহু উক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়। একইভাবে, মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র তাঁর নাগরিক অধিকার আন্দোলন ও লেখালেখিতে অন্যায়ের মুখে নীরবতা এবং নৈতিক দায়িত্বের প্রশ্নটি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। তাঁদের নামে প্রচলিত উক্তিগুলোর শব্দে শব্দে যথার্থতা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সচেতন অবস্থান নেওয়ার নৈতিক গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই।
কাজেই আজ সময় এসেছে এই ছদ্মবেশী সুবিধাবাদীদের চিনে রাখার এবং তাদের প্রতি অযৌক্তিক ভীতি কাটিয়ে সম্মিলিতভাবে অন্যায়ের প্রতিবাদ জানানোর। কর্মক্ষেত্র ও সমাজকে রক্ষা করতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ ও নৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি স্তরে মেধা, সততা, যোগ্যতা ও ন্যায়বিচারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। ব্যক্তিগত আনুগত্য, ধর্মীয় লেবাস কিংবা ক্ষমতার তোষামোদ যেন কখনোই যোগ্যতার বিকল্প হয়ে উঠতে না পারে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, ধর্মের প্রকৃত মর্যাদা রক্ষা করতে হলে ধর্মকে ব্যক্তিস্বার্থের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে সৎ ও যোগ্য মানুষ সম্মান পাবেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহসীরা নিরাপদ থাকবেন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারকারীরা জবাবদিহির আওতায় আসবেন। কোনো ব্যক্তি কতটা ধার্মিক, তা শুধু তার বাহ্যিক পরিচয় দেখে নির্ধারণ করা যায় না; তার সততা, ন্যায়পরায়ণতা, আমানতদারি এবং মানুষের প্রতি আচরণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
মেধা, সততা ও ইনসাফের ভিত্তিতে কর্মক্ষেত্র পুনর্গঠন করতে না পারলে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন, সামাজিক অগ্রগতি ও জাতীয় সমৃদ্ধির স্বপ্ন কেবলই অন্ধকারের অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবে।
লেখক: অধ্যাপক সাবির আমিন রেজা