ভালো ঘুমের জন্য শুধু আরামদায়ক বিছানা বা নিয়মিত সময়ে ঘুমাতে যাওয়াই যথেষ্ট নয়। সঠিক বালিশ বেছে নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। এটি ঘাড় ও মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক অবস্থান এবং সামগ্রিক আরামের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সবার জন্য একই ধরনের বা একই উচ্চতার বালিশ উপযুক্ত নয়। বরং বালিশ বেছে নেওয়ার সময় ঘুমানোর ভঙ্গি, শরীরের গঠন, কাঁধের প্রস্থ এবং ম্যাট্রেস কতটা শক্ত, এসব বিষয় বিবেচনা করা উচিত।
ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞ ড. ক্রিস ম্যাকার্থি বলেন, তিনি নিজের পছন্দের বালিশ ছাড়া ভ্রমণ করতে পছন্দ করেন না। এমনকি হোটেলে থাকলেও ঘাড়ের প্রয়োজনীয় সাপোর্ট পেতে সেখানকার বালিশগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী সাজিয়ে নেন।
ম্যাকার্থির মতে, অনুপযুক্ত বালিশ অস্বস্তি, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া এবং ব্যথার কারণ হতে পারে। তাই বালিশটি নরম বা দেখতে আরামদায়ক মনে হচ্ছে কি না, শুধু তার ওপর নির্ভর না করে কীভাবে ঘুমান, সেটি বিবেচনা করা উচিত।
ঘুমানোর ভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ
বেশির ভাগ মানুষ তিনটি প্রধান ভঙ্গির কোনো একটিতে ঘুমান: কাত হয়ে, চিৎ হয়ে অথবা উপুড় হয়ে। প্রতিটি ভঙ্গিতে ঘাড় ও মেরুদণ্ডের ওপর ভিন্ন ধরনের চাপ পড়ে। তাই বালিশের উচ্চতা ও দৃঢ়তাও ঘুমানোর ভঙ্গি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।
উপুড় হয়ে ঘুমালে ভঙ্গি পুনর্বিবেচনা করুন
বিশেষজ্ঞরা সাধারণত উপুড় হয়ে ঘুমানো নিরুৎসাহিত করেন। কারণ এভাবে ঘুমালে দীর্ঘ সময় ঘাড় একদিকে ঘুরিয়ে রাখতে হয়। এর ফলে ঘাড়ের কিছু পেশি ও লিগামেন্টে দীর্ঘস্থায়ী চাপ পড়তে পারে, যা সময়ের সঙ্গে ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, অস্বস্তি বা ব্যথার কারণ হতে পারে। সম্ভব হলে এমন ঘুমের ভঙ্গি বেছে নেওয়া ভালো, যেখানে ঘাড় স্বাভাবিক ও নিরপেক্ষ অবস্থায় থাকতে পারে।
চিৎ হয়ে ঘুমালে বালিশ কতটা উঁচু হওয়া উচিত
চিৎ হয়ে ঘুমানো ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আদর্শ বালিশের উচ্চতা কিছুটা নির্ভর করে ঘাড় ও ওপরের মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক গঠনের ওপর। কারও ঘাড় ও ওপরের মেরুদণ্ডের বাঁক তুলনামূলক বেশি হলে একটু মোটা বালিশ বেশি আরামদায়ক হতে পারে। আবার যাঁদের দেহের গঠন তুলনামূলক সমতল, তাঁরা পাতলা বালিশে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে পারেন। তাই সব চিৎ হয়ে ঘুমানো মানুষের জন্য একই উচ্চতার বালিশ উপযুক্ত, এমন কোনো সার্বজনীন নিয়ম নেই।
কাত হয়ে ঘুমালে কাঁধের প্রস্থ বিবেচনা করুন
যাঁরা মূলত কাত হয়ে ঘুমান, তাঁদের বালিশ বাছাইয়ের সময় কাঁধের প্রস্থের দিকে নজর দেওয়া উচিত। যাঁদের কাঁধ তুলনামূলক চওড়া, তাঁদের মাথা ও ঘাড়কে মেরুদণ্ডের সঙ্গে সঠিকভাবে সমান্তরালে রাখতে তুলনামূলক উঁচু বালিশ প্রয়োজন হতে পারে। তবে শুধু কাঁধের প্রস্থই নয়, ম্যাট্রেস কতটা শক্ত, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
ম্যাট্রেসের দৃঢ়তা বালিশের আদর্শ উচ্চতা পরিবর্তন করতে পারে
ম্যাট্রেস নরম না শক্ত, তার ওপর নির্ভর করে শরীর ম্যাট্রেসের মধ্যে বিভিন্ন মাত্রায় ডুবে যায়। উদাহরণস্বরূপ, কেউ শক্ত ম্যাট্রেসের ওপর কাত হয়ে ঘুমালে তাঁর কাঁধ খুব বেশি ডুবে যাবে না। ফলে মাথা ও ঘাড়কে সঠিক অবস্থানে রাখতে তুলনামূলক মোটা বালিশ প্রয়োজন হতে পারে।
অন্যদিকে, নরম ম্যাট্রেসে কাঁধ বেশি ডুবে যেতে পারে। ফলে মাথাকে আরামদায়ক উচ্চতায় রাখতে অপেক্ষাকৃত পাতলা বালিশই যথেষ্ট হতে পারে। চিৎ হয়ে ঘুমানো ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই প্রভাব সাধারণত কম, কারণ তাঁদের শরীরের ওজন ম্যাট্রেসের ওপর ভিন্নভাবে বণ্টিত হয়।
নতুন বালিশ কেনার আগে তোয়ালে দিয়ে পরীক্ষা করুন
বর্তমান বালিশটি খুব পাতলা মনে হলে নতুন বালিশ কেনার আগে এর উচ্চতা বাড়িয়ে পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে। ম্যাকার্থি পরামর্শ দেন, বালিশের নিচে একটি ভাঁজ করা তোয়ালে রেখে প্রয়োজন অনুযায়ী কয়েকটি স্তর যোগ করতে। এতে কাঙ্ক্ষিত উচ্চতা বের করা সহজ হবে। নতুন বালিশ কেনার সময় কী উচ্চতার বালিশ প্রয়োজন হতে পারে, সেটিও এই পদ্ধতিতে বোঝা যায়।
একইভাবে বালিশের ঘাড়ের নিচের অংশে একটি রোল করা তোয়ালে রাখা যেতে পারে। এতে অতিরিক্ত ঘাড়ের সাপোর্ট দিলে বেশি আরাম হয় কি না, তা পরীক্ষা করা সম্ভব।
বিশেষ আকৃতির বালিশ কি ভালো
বাজারে বিভিন্ন আকৃতির বালিশ পাওয়া যায়, যেমন সার্ভাইকাল, এরগনোমিক বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য তৈরি বলে প্রচার করা বালিশ। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্দিষ্ট কোনো বিশেষ আকৃতির বালিশ সাধারণ বালিশের চেয়ে সবার জন্য বেশি কার্যকর, এমন প্রমাণ এখনো সীমিত।
কিছু গবেষণা থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, ঘাড়ের অংশে সামান্য বেশি উচ্চতাযুক্ত বালিশ কিছু কাত হয়ে ঘুমানো মানুষের জন্য ভালো সাপোর্ট দিতে পারে। কাত হয়ে ঘুমানোর ক্ষেত্রে মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মাথাকে যথেষ্ট সাপোর্ট দেওয়া, যাতে ঘাড় বা মেরুদণ্ড অপ্রয়োজনীয়ভাবে একদিকে বেঁকে না যায়।
চিৎ হয়ে ঘুমানোর জন্য তৈরি কিছু বালিশের মাঝখানে অল্প গভীর অংশ এবং দুই পাশে কিছুটা উঁচু অংশ থাকে। এতে মাথা তুলনামূলক স্থির অবস্থায় রাখা সম্ভব হতে পারে। তবে কিছু মানুষের কাছে এ ধরনের নকশা অস্বস্তিকর বা অতিরিক্ত বাঁধাধরা মনে হতে পারে। বিশেষজ্ঞের মতে, যাঁদের মাথা তুলনামূলক বড় বা ভারী, তাঁদের জন্যও মোটা ও বেশি সাপোর্ট দেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন বালিশ প্রয়োজন হতে পারে।
তুলা, পালক নাকি ফোম
বালিশের ভেতরের উপাদানও আরাম, তাপমাত্রা এবং বালিশের আকৃতি ধরে রাখার ক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলে। পালক ও অন্যান্য নরম প্রাকৃতিক উপাদানে ভরা বালিশ গরম আবহাওয়ায় তুলনামূলক ঠান্ডা অনুভূত হতে পারে, কারণ এগুলো মাথার চারপাশের তাপ কিছুটা বের হতে সাহায্য করতে পারে। তবে এ ধরনের বালিশ রাতে নড়াচড়ার কারণে আকৃতি পরিবর্তন করতে পারে। ভেতরের উপাদান চাপা পড়ে যেতে পারে বা একদিকে সরে যেতে পারে, ফলে ঘাড়ের প্রয়োজনীয় সাপোর্ট কমে যেতে পারে।
হলো ফাইবার বা সূক্ষ্ম সিনথেটিক ফাইবারে ভরা বালিশ সাধারণত তুলনামূলক ভালোভাবে আকৃতি ধরে রাখে। তবে কিছু প্রাকৃতিক উপাদানের মতো কার্যকরভাবে তাপ বের করতে নাও পারে। কিছু বালিশের নিচের অংশে অপেক্ষাকৃত শক্ত উপাদান ব্যবহার করা হয়, যাতে সারা রাত বালিশের আকৃতি বজায় থাকে।
সবার জন্য নিখুঁত কোনো বালিশ নেই
বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেন, বালিশ বেছে নেওয়ার সময় ব্যক্তির শরীরের গঠন, ঘুমানোর ভঙ্গি এবং ব্যক্তিগত আরাম, সবকিছু বিবেচনা করা উচিত। সবার জন্য সমানভাবে উপযুক্ত এমন কোনো নির্দিষ্ট বালিশের নকশা নেই।
সম্ভব হলে এমন বালিশ বেছে নেওয়া ভালো, যেটিতে ট্রায়াল পিরিয়ড রয়েছে। এতে কেনার আগে কিছুদিন ব্যবহার করে বোঝা যায়, বালিশটি যথেষ্ট সাপোর্ট ও আরাম দিচ্ছে কি না।
সবশেষে, সবচেয়ে ভালো বালিশ সেটিই, যা মাথা ও ঘাড়কে আরামদায়কভাবে সাপোর্ট দেয় এবং আপনার ঘুমানোর ধরন অনুযায়ী মাথা ও ঘাড়কে স্বাভাবিক অবস্থানে রাখতে সাহায্য করে।
সূত্র: সামা টিভি
kalprakash.com/IM