স্বাস্থ্য খাতে গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের অগ্রগতি এখন আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানেও স্পষ্ট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে জন্মের সময় প্রত্যাশিত গড় আয়ু ছিল ৭২ দশমিক ৭ বছর। একই সময়ে ভারতে গড় আয়ু ছিল ৭১ বছর এবং পাকিস্তানে ৬৮ দশমিক ২ বছর। অর্থাৎ গড় আয়ুর হিসাবে ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মানুষের গড় আয়ু বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে গড় আয়ু ছিল ৭৮ দশমিক ৫ বছর এবং কানাডায় ৮১ দশমিক ৪ বছর।
ডব্লিউএইচওর গ্লোবাল হেলথ এস্টিমেটসে (Global Health Estimates) ২০০০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের গড় আয়ু, সুস্থভাবে বেঁচে থাকার প্রত্যাশিত সময়, মৃত্যুর কারণ এবং রোগের বোঝার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। গত শুক্রবার প্রকাশিত এই হিসাব অনুযায়ী, করোনাভাইরাস মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে বিশ্বজুড়ে গড় আয়ু প্রায় মহামারিপূর্ব অবস্থায় ফিরে এসেছে। তবে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার প্রত্যাশিত সময় পুনরুদ্ধার হয়েছে তুলনামূলক ধীরগতিতে।
কয়েক দশকে বদলে গেছে বাংলাদেশের চিত্র
বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান বুঝতে হলে কয়েক দশক পেছনে তাকাতে হয়। ১৯৭৯ সালে দেশটি যখন জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি চালু করে, তখন প্রতি ১ হাজার জীবিত জন্ম নেওয়া শিশুর মধ্যে ২১১ জনেরই পাঁচ বছর বয়সের আগে মারা যাওয়ার আশঙ্কা ছিল।
স্বাধীনতার মাত্র আট বছর পরের সেই সময়ে বাংলাদেশ ছিল অত্যন্ত দরিদ্র একটি দেশ। রোগের প্রকোপ ছিল বেশি, চিকিৎসক ও নার্সের ঘাটতিও ছিল ব্যাপক। তখন একজন বাংলাদেশির প্রত্যাশিত গড় আয়ু ছিল মাত্র ৪৭ বছর।
কিন্তু কয়েক দশকের ব্যবধানে পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অগ্রগতি নিয়ে এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুহার প্রতি ১ হাজার জীবিত জন্মে ৩১ জনে নেমে এসেছে। একই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের গড় আয়ু ৭৩ দশমিক ৭ বছর বলে উল্লেখ করা হয়।
অর্থাৎ টিকাদান, শিশুস্বাস্থ্য, রোগ প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্যসেবার বিস্তারের মতো ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতির সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের আয়ুও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
শুধু দীর্ঘদিন বাঁচা নয়, সুস্থ থাকাও জরুরি
গড় আয়ু একটি দেশের জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলেও বেশি দিন বেঁচে থাকলেই যে সেই সময়টা সুস্থভাবে কাটছে, তা নয়। ডব্লিউএইচওর সর্বশেষ হিসাবেও এই পার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে।
ভারতের ক্ষেত্রে ২০২৩ সালে গড় আয়ু ছিল ৭১ বছর, কিন্তু সুস্থভাবে বেঁচে থাকার প্রত্যাশিত সময় ছিল ৬০ দশমিক ৬ বছর। ২০১৯ সালে এই সময় ছিল ৬০ দশমিক ৫ বছর। করোনার প্রভাবে ২০২১ সালে তা কমে ৫৮ দশমিক ৪ বছরে নেমে গিয়েছিল। পরে ২০২২ সালে বেড়ে ৬০ দশমিক ২ বছর এবং ২০২৩ সালে ৬০ দশমিক ৬ বছরে দাঁড়ায়।
ভারতে ২০১৯ সালে গড় আয়ু ছিল ৭০ দশমিক ৫ বছর। ২০২১ সালে তা কমে ৬৮ দশমিক ১ বছরে নেমে আসে। পরে ২০২২ সালে ৭০ দশমিক ৫ এবং ২০২৩ সালে ৭১ বছরে ফিরে আসে। অর্থাৎ দুই বছরের মধ্যে দেশটি প্রত্যাশিত গড় আয়ুর ২ দশমিক ৯ বছর ফিরে পেয়েছে। তবে একই সময়ে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার প্রত্যাশিত সময় বেড়েছে ২ দশমিক ২ বছর।
বিশ্বজুড়ে মহামারির প্রভাব
ডব্লিউএইচওর হিসাবে, ২০২৩ সালে বৈশ্বিক গড় আয়ু ছিল ৭৩ দশমিক ৩ বছর। ২০১৯ সালে তা ছিল ৭৩ দশমিক ৪ বছর। অর্থাৎ করোনার আগের অবস্থার কাছাকাছি ফিরে এসেছে বৈশ্বিক গড় আয়ু। তবে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার প্রত্যাশিত সময় একই গতিতে ফিরছে না।
ডব্লিউএইচওর ডেটা বিভাগের প্রধান অ্যালাইন ল্যাবরিক বলেন, ‘জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে আরও বেশি গড় আয়ু হওয়া একটি বড় অর্জন। পরবর্তী চ্যালেঞ্জ হলো মানুষ যেন সুস্থ শরীর নিয়ে বেশিদিন বাঁচতে পারে।’
বাংলাদেশের গত কয়েক দশকের অভিজ্ঞতাও দেখায়, শুধু মানুষের আয়ু বাড়ানো নয়, দীর্ঘ জীবনের বছরগুলোকে সুস্থ ও কর্মক্ষম করে তোলাই এখন জনস্বাস্থ্যের পরবর্তী বড় লক্ষ্য। শিশু মৃত্যুহার কমানো ও গড় আয়ু বাড়ানোর সাফল্যের পর বাংলাদেশের সামনে তাই স্বাস্থ্যকর দীর্ঘায়ু নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), টাইমস অফ ইন্ডিয়ার বরাতে বাংলাদেশ প্রতিদিন
kalprakash.com/IM