পৃথিবীতে মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর একটি হলো তার সন্তান। আর সন্তানকে সঠিকভাবে লালন-পালন করে একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা বর্তমান সময়ে অভিভাবকদের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন নানা ধরনের সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের প্রভাব খুব সহজেই শিশু-কিশোরদের ওপর পড়ছে।
সাম্প্রতিক অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে আবারও সামনে এসেছে কিশোর অপরাধের ভয়াবহ বাস্তবতা। কিশোর গ্যাং, ছিনতাই, মাদক, মারামারি, ইভ টিজিং কিংবা অনলাইন আসক্তির মতো নানা ঘটনায় কিশোরদের জড়িয়ে পড়ার খবর প্রায়ই সামনে আসে। কিন্তু এসব ঘটনা প্রতিরোধে পরিবার ও সমাজে প্রয়োজনীয় সচেতনতা কতটা তৈরি হয়েছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
একজন কিশোর হঠাৎ করেই অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে না। এর পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের নানা অভিজ্ঞতা ও পরিবেশের প্রভাব। পারিবারিক অমনোযোগ, ভুল বন্ধুত্ব, অনিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতা, সন্তানের সঙ্গে বাবা-মায়ের দূরত্ব এবং সামাজিক পরিবেশ—সবকিছু মিলেই ধীরে ধীরে তার চিন্তা ও আচরণে পরিবর্তন আনতে পারে। একসময় যে কাজকে সে অন্যায় বা ভয়ংকর মনে করত, ধীরে ধীরে সেটিই তার কাছে স্বাভাবিক, এমনকি সাহসিকতার বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
তাই কিশোর অপরাধ প্রতিরোধের কাজ শুধু অপরাধে জড়িয়ে পড়া কিশোরকে গ্রেপ্তার বা শাস্তি দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যথেষ্ট নয়। অপরাধের পথে যাওয়ার আগেই সন্তানকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। আর এই দায়িত্বের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো পরিবার।
সন্তানের জন্য সময় কতটা দিচ্ছি?
ব্যবসা, চাকরি কিংবা ক্যারিয়ার গড়ার পেছনে মানুষ বিপুল সময়, অর্থ ও শ্রম ব্যয় করে। অথচ অনেক বাবা-মা সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা, তার মানসিক অবস্থা বোঝা কিংবা তার দৈনন্দিন জীবনের খোঁজ নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না।
ভালো স্কুল, কলেজ কিংবা মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করিয়ে দেওয়াই সন্তানের প্রতি দায়িত্বের শেষ নয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জ্ঞান দিতে পারে, কিন্তু সন্তানের চরিত্র, মূল্যবোধ ও মানসিক বিকাশে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভালোবাসা, সময়, শাসন, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও নিয়মিত তদারকির সমন্বয়েই একটি শিশুর সুস্থ বিকাশ সম্ভব।
ইসলামী শিক্ষাতেও সন্তান পালনের ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সহিহ হাদিসে সন্তানকে তার স্বাভাবিক পবিত্র প্রবণতা নিয়ে জন্মগ্রহণকারী হিসেবে উল্লেখ করে তার পারিবারিক পরিবেশের প্রভাবের কথা বলা হয়েছে।
বন্ধুত্বের বিষয়েও নজর জরুরি
কৈশোর এমন একটি সময়, যখন সমবয়সী বন্ধুদের প্রভাব একজন কিশোরের ওপর গভীরভাবে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের চেয়ে বন্ধুর কথাই তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাই সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে, অবসর সময়ে কী করছে এবং অনলাইনে কার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন থাকা প্রয়োজন।
তবে নজরদারি মানেই কঠোর নিয়ন্ত্রণ নয়। সন্তানের সঙ্গে এমন একটি বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি করতে হবে, যাতে সে নিজের সমস্যা, ভয়, ভুল কিংবা উদ্বেগের কথা বাবা-মায়ের কাছে সহজে বলতে পারে। বন্ধুত্বপূর্ণ যোগাযোগ থাকলে অনেক ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগেই তা শনাক্ত করা সম্ভব।
হাদিসে মানুষের ওপর ঘনিষ্ঠ বন্ধুর প্রভাবের বিষয়টি তুলে ধরে বন্ধুত্ব নির্বাচনে সতর্ক হওয়ার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। তাই সন্তানকে শুধু ‘ভালো বন্ধু নির্বাচন করো’ বললেই দায়িত্ব শেষ হয় না; তাকে ভালো-মন্দের পার্থক্য বোঝানোর পাশাপাশি তার সামাজিক পরিবেশ সম্পর্কেও সচেতন থাকতে হবে।
সন্তানকে গড়ে তোলাই বড় বিনিয়োগ
পার্থিব জীবনের সম্পদ, পদ-পদবি কিংবা ক্যারিয়ার একসময় শেষ হয়ে যায়। কিন্তু একজন সৎ, চরিত্রবান ও দায়িত্বশীল সন্তান পরিবার, সমাজ ও দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ হয়ে ওঠে। ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, নেক সন্তান তার বাবা-মায়ের জন্য দোয়া করলে মৃত্যুর পরও তার সওয়াবের ধারাবাহিকতা বজায় থাকতে পারে।
তাই সন্তান লালন-পালনকে কেবল পারিবারিক দায়িত্ব হিসেবে দেখলে এর গুরুত্ব পুরোপুরি উপলব্ধি করা হয় না। এটি একই সঙ্গে একটি নৈতিক দায়িত্ব এবং ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ আমল।
সন্তানকে ভালো শিক্ষার পাশাপাশি মানবিকতা, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ, দেশপ্রেম ও ধর্মীয় মূল্যবোধ শেখাতে হবে। তার কথা শুনতে হবে, ভুল হলে বুঝিয়ে বলতে হবে এবং প্রয়োজনের সময় দৃঢ়ভাবে সঠিক পথ দেখাতে হবে।
দিনের শেষে একজন বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় অর্জন শুধু বাড়ি, অর্থ কিংবা ক্যারিয়ার নয়—একজন ভালো মানুষ হিসেবে সন্তানকে গড়ে তুলতে পারা। তাই সন্তানের পেছনে সময় দেওয়া কোনো অতিরিক্ত দায়িত্ব নয়; বরং সেটিই হওয়া উচিত জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ।