২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছিলেন ছাত্রনেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তবে দায়িত্ব পালনের প্রায় দেড় বছরের মাথায় সংস্কার ও ইতিবাচক কাজের চেয়ে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, নিয়োগ-বদলি, টেন্ডার বাণিজ্য এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগেই বারবার আলোচনায় এসেছে তাঁর নাম। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) সাবেক এই উপদেষ্টার বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম ও অর্থপাচারের বিস্তর অভিযোগ জমা পড়েছে।
এর আগে গত ৪ মার্চ বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) আসিফ মাহমুদের ব্যাংক হিসাব তলব করে। পরদিনই সংবাদ সম্মেলন করে নিজের ও পরিবারের ব্যাংক হিসাবের তথ্য প্রকাশ করেন তিনি। সেখানে তিনি জানান, সোনালী ব্যাংকের সেভিংস অ্যাকাউন্টে তাঁর ৯ হাজার ৯৩০ টাকা রয়েছে। আর সরকারি দায়িত্বে থাকাকালীন স্যালারি অ্যাকাউন্টে ১৬ মাসের বেতন-ভাতা (গড়ে ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা) ও পাঁচটি বিদেশ সফরের টিএ-ডিএ বিল মিলিয়ে জমা হয় মোট ৮৫ লাখ ৮১ হাজার টাকা এবং উত্তোলন করা হয় ৭৬ লাখ ৩ হাজার টাকা। দুটি অ্যাকাউন্ট মিলিয়ে তাঁর জমা ছিল ৯ লাখ ৭৮ হাজার ৫৫৬ টাকা।
এছাড়া তাঁর শিক্ষক বাবার পাঁচটি অ্যাকাউন্টে ৫ লাখ ৪৭ হাজার ৭১১ টাকা জমা এবং সার্ভিস লোনের দায় রয়েছে ৬ লাখ ৩৯ হাজার ৭৪৬ টাকা। অন্যদিকে তাঁর মায়ের অ্যাকাউন্টে ২১ হাজার ১৫৪ টাকা এবং স্ত্রীর অ্যাকাউন্টে ৬১৩ টাকা থাকার তথ্য দেন তিনি। তবে এ হিসাব নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাস মিলিয়ে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন খাতভিত্তিক মোট ১১টি দুর্নীতির লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে।
অভিযোগগুলোর সারসংক্ষেপ: ১. উন্নয়ন প্রকল্পে কমিশন বাণিজ্য: স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দের ২৫ শতাংশ অর্থ উপদেষ্টার জন্য কমিশন হিসেবে না দিলে অর্থছাড় না করার অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট এক ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির মাধ্যমে এই কমিশন তদারকি করা হতো।
২. ওয়াসার এমডি নিয়োগে ঘুষ লেনদেন: অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে বিতর্কিত প্রক্রিয়ায় ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আব্দুস সালামকে। অভিযোগ রয়েছে, এই নিয়োগের বিনিময়ে ১০ কোটি টাকা লেনদেন হয়; যার মধ্যে ৮ কোটি টাকা দুবাইয়ের আল আনসারি মানি এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে পাচার এবং বাকি ২ কোটি টাকা নগদে পরিশোধ করা হয়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত ৮ মার্চ তিনি পদত্যাগ করেন।
৩. উত্তর সিটিতে প্রশাসক নিয়োগ বাণিজ্য: ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক হিসেবে মোহাম্মদ এজাজকে নিয়োগ দেওয়া হয়। অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, নগদ ২০ কোটি টাকা এবং প্রতিটি উন্নয়ন কাজের ১০ শতাংশ নিয়মিত কমিশনের শর্তে এ নিয়োগ চূড়ান্ত হয়েছিল। পরবর্তীতে দুর্নীতির নানা অভিযোগে তাঁকে অপসারণ করা হয় এবং আদালত তাঁর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।
৪. এলজিইডিতে বদলি ও পদোন্নতি বাণিজ্য: স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগ এবং নির্বাহী প্রকৌশলীদের সুবিধাজনক স্থানে বদলির জন্য কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ১৬ জন নির্বাহী প্রকৌশলীকে একযোগে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব দেওয়া এবং জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী জাবেদ করিমকে প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব দেওয়ার পেছনেও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
৫. জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে অনিয়ম: গ্রামীণ স্যানিটেশন প্রকল্পের আওতায় অন্তত ১০টি স্থানে বাস্তব কাজ ছাড়াই বিল উত্তোলনসহ একাধিক প্রকল্পে শতকোটি টাকা নয়ছয়ের অভিযোগ জমা পড়েছে।
৬. সাড়ে তিন হাজার কোটির টেন্ডার বাণিজ্য: স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকাকালে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার টেন্ডার নিষ্পত্তিতে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, যার সমর্থনে একটি কল রেকর্ডও সংযুক্ত করা হয়েছে।
৭. ডিসি ও পদায়ন বাণিজ্য: জনপ্রশাসনে প্রভাব খাটিয়ে সারাদেশে জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগের জন্য ৪৮টি ডিও লেটার দেওয়া হয়, যার মধ্যে ৩৬ জনকেই পদায়ন করা হয়েছিল। জেলাভেদে প্রতিটি ডিসি পদায়নে ২ থেকে ১০ কোটি টাকা লেনদেনের দাবি রয়েছে অভিযোগে।
৮. এপিএস বিতর্ক ও বিদেশে পাচার: আসিফ মাহমুদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু মো. মোয়াজ্জেম হোসেনকে এপিএস হিসেবে নিয়োগের পর বিভিন্ন অনিয়ম ও প্রায় ৬০০ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। পরে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং তিনি বর্তমানে দুবাইয়ে অবস্থান করছেন বলে জানা যায়।
৯. বাবার ঠিকাদারি সিন্ডিকেট: দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর বাবার প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স ইসরাত এন্টারপ্রাইজ’কে ঠিকাদারি তালিকাভুক্ত করা হয়। পরে সমালোচনার মুখে তা বাতিল হলেও স্থানীয় অঞ্চলে ঠিকাদারি সিন্ডিকেট তাঁর নিয়ন্ত্রণেই পরিচালিত হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
১০. ক্রিপ্টোকারেন্সি ও দুবাইয়ে সম্পদ: বিভিন্ন মাধ্যমে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অবৈধ আয়ের একটি বড় অংশ ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর এবং দুবাইয়ে রিয়েল এস্টেট ও ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়েছে।
সাবেক এই উপদেষ্টার বিরুদ্ধে ওঠা হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ অনুসন্ধান ও বিচার দাবি করেছেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “দায়িত্বশীল পদে থাকাকালে কারও বিরুদ্ধে যখন ক্ষমতার অপব্যবহার ও আর্থিক দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠে, তখন জনস্বার্থেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত তা নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্তভাবে তদন্ত করা।”
kalprakash.com/IM