দূরপাল্লার যাত্রায় স্বাচ্ছন্দ্যের কারণে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে স্লিপার কোচ। বাড়তি ভাড়া দিয়েও সাধারণ যাত্রীরা এসব বাসে যাতায়াত করছেন। তবে আরামদায়ক ভ্রমণের আড়ালে বড় ধরনের নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে ৮২৯টি স্লিপার বাস চলাচল করছে, যার একটিরও স্লিপার কোচ হিসেবে চলাচলের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদন নেই।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) হাইকোর্টে দাখিল করা এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে বিআরটিএ। শুনানির পর আদালত স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে জানিয়েছেন, বিআরটিএর অনুমোদন ছাড়া কোনো স্লিপার বাস মহাসড়কে চলতে পারবে না। একই সঙ্গে অনুমোদনহীন ও অবৈধভাবে রূপান্তরিত এসব বাসের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাসহ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
তবে প্রশ্ন উঠেছে, অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এত বিপুলসংখ্যক স্লিপার বাস বছরের পর বছর সড়কে নির্বিঘ্নে চলাচল করছে। সাধারণ বাস হিসেবে নিবন্ধনের পর অবৈধভাবে কাঠামো পরিবর্তন করে স্লিপার কোচে রূপান্তর করা হলে সেগুলোর ফিটনেস সনদ ও রুট পারমিট কীভাবে নবায়ন হলো—তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বিআরটিএর ইঞ্জিনিয়ারিং শাখার পরিচালক মো. শহিদুল্লাহ জানান, অনেক বাস শুরুতে সাধারণ একতলা বাস হিসেবে নিবন্ধন নিয়েছিল। পরবর্তীতে মালিকপক্ষ নিয়মবহির্ভূতভাবে সেগুলোর বডি ও ভেতরের কাঠামো পরিবর্তন করে স্লিপার কোচে রূপান্তর করেছে।
পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বিদেশ থেকে আমদানি করা অধিকাংশ চেসিস মূলত একতলা বাসের উপযোগী। কিন্তু স্থানীয় গ্যারেজ ও বডি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানে সেসব চেসিসে কাঠামো ও উচ্চতা বাড়িয়ে স্লিপার বা ডাবল ডেকার কোচ তৈরি করা হচ্ছে। এর ফলে বাসের উচ্চতা, ভারসাম্য, ওজন ও যাত্রী ধারণক্ষমতায় মারাত্মক বিকৃতি ঘটে, যা দীর্ঘযাত্রায় ও দ্রুতগতির মহাসড়কে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করে।
পরিবহন ও দুর্ঘটনা বিশেষজ্ঞ ড. হাদিউজ্জামান বলেন, অনুমোদনহীনভাবে কাঠামো পরিবর্তনের ফলে বাসের চেসিস, সাসপেনশন ও ব্রেকিং সিস্টেমে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। ফলে জরুরি পরিস্থিতিতে চালকের পক্ষে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। স্থানীয় গ্যারেজে এভাবে বাস রূপান্তর হওয়ার পরও সড়কে নামার আগে তা কেন শনাক্ত করা যায়নি, সে বিষয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর গাবতলী, আমিনবাজার, মানিকনগর ও যাত্রাবাড়ী এলাকার ওয়ার্কশপগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে গোপনে এসব স্লিপার কোচের বডি তৈরি ও পরিবর্তন করা হচ্ছে। গত ১৯ আগস্ট যাত্রাবাড়ীতে অভিযান চালিয়ে অনুমোদনহীন কাঠামো তৈরির দায়ে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে আড়াই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এর আগের দিন গাবতলী, আমিনবাজার ও মানিকনগরের বেশ কয়েকটি গ্যারেজে অভিযান চালিয়ে চারটি প্রতিষ্ঠানকে ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা জরিমানা, আটটি গাড়ি ডাম্পিং, দুটি স্লিপার বাস জব্দ এবং একটি গ্যারেজ সিলগালা করে প্রশাসন।
বাংলাদেশ স্লিপার এসি বাস মালিক সমিতির সভাপতি আফতাব উদ্দিন মাসুদ অভিযোগ করেন, বিআরটিএর কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই এসব বাসের রুট পারমিট ও কাগজপত্র নবায়ন করা হয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী প্রশ্ন রেখে বলেন, নিবন্ধনের সময় বাস একতলা থাকলে পরবর্তীতে কাঠামোগত পরিবর্তনের বিষয়টি প্রতিবছরের ফিটনেস পরীক্ষায় কেন ধরা পড়ল না? অনুমোদনহীন বাস কীভাবে নিয়মিত রুট পারমিট পেল, তার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া জরুরি।
স্লিপার কোচের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০২৫ সালে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন আইনজীবী হুজ্জাতুল ইসলাম খান। শুনানির ধারাবাহিকতায় আদালত অনুমোদনহীন সব স্লিপার বাস বন্ধের সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেন।
সাম্প্রতিক সময়ে স্লিপার কোচের বেশ কয়েকটি বড় দুর্ঘটনা যাত্রী সাধারণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। গত ৯ জানুয়ারি মিরসরাইয়ে ট্রাকের পেছনে স্লিপার কোচের ধাক্কায় ৩ জন নিহত হন। মার্চে বিরামপুরে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকে ধাক্কা লেগে মারা যান ২ জন। ১৭ আগস্ট দাউদকান্দিতে চলন্ত স্লিপার কোচে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এছাড়া গত ৪ সেপ্টেম্বর কলাপাড়ায় একটি ডাবল ডেকার স্লিপার বাস পুকুরে পড়ে অন্তত ১৫ জন যাত্রী আহত হন।
সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ অনুযায়ী, কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন ছাড়া মোটরযানের অবয়ব, দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা কিংবা আসনবিন্যাস পরিবর্তন সম্পূর্ণ বেআইনি ও দণ্ডনীয় অপরাধ। ফলে সড়কে চলাচলকারী ৮২৯টি অবৈধ স্লিপার বাসের ভবিষ্যৎ, যাত্রী নিরাপত্তা এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি এখন সর্বমহলে।
kalprakash.com/IM