বর্জ্য থেকে পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে কার্বন ক্রেডিট অর্জন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। রাজধানীর আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে বাস্তবায়নাধীন দেশের প্রথম বৃহৎ বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে এই কার্বন ক্রেডিট পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এই উদ্যোগের ফলে একদিকে যেমন ঢাকার বিশাল বর্জ্য সমস্যার টেকসই সমাধান হবে, অন্যদিকে বিশ্বমঞ্চে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাসের স্বীকৃতি হিসেবে বিপুল অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে দেশ।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আমিনবাজার ল্যান্ডফিলের বর্জ্য কাজে লাগিয়ে ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই প্রকল্পে চীনের সিএমইসি গ্রুপের সঙ্গে অর্থায়ন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর ও সিটি করপোরেশনের সমন্বয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালের মধ্যেই এই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত হবে।
প্রকল্পটিতে চীনের সরাসরি বিনিয়োগ প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। অর্থায়নে যুক্ত রয়েছে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি), নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি), ডিবিএস ও ব্যাংক অব চায়নাসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে আমিনবাজার ল্যান্ডফিল ব্যবস্থাপনায় সিটি করপোরেশনের বছরে ব্যয় হয় ৫২০ কোটি টাকা। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পুরোদমে চালু হলে সিটি করপোরেশনের এই বিশাল ব্যয় সাশ্রয় হবে। একই সঙ্গে কার্বন নিঃসরণ কমানোর স্বীকৃতি হিসেবে আন্তর্জাতিক কার্বন বাজার থেকে প্রতিবছর প্রায় ৯০ কোটি টাকার কার্বন ক্রেডিট অর্জন করতে পারবে বাংলাদেশ।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, আপাতদৃষ্টিতে এটি প্রতি ইউনিট ২৫ টাকা দরে বিদ্যুৎ কেনার মতো মনে হলেও ল্যান্ডফিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় সাশ্রয় ও কার্বন ক্রেডিটের সুবিধা যুক্ত হওয়ায় শেষ পর্যন্ত কার্যকর উৎপাদন ব্যয় নেমে আসবে ইউনিটপ্রতি ১০ টাকার নিচে।
বায়ুমণ্ডলে এক মেট্রিক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড বা সমপরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানোর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে একটি কার্বন ক্রেডিট প্রদান করা হয়। সম্প্রতি এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে দেশের কার্বন ক্রেডিট বাড়ানোর জন্য একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, টেকসই বনায়ন এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার গড়ে তুলে আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
আমিনবাজার প্রকল্পে চীন নিজস্ব উদ্ভাবিত ইনসিনারেটর গ্রেট প্রযুক্তি ব্যবহার করবে, যা অধিক আর্দ্রতাসম্পন্ন বর্জ্যকেও উচ্চ তাপমাত্রায় পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম। পাশাপাশি রিফিউজ-ডেরিভড ফুয়েল (আরডিএফ) এবং বায়োমেথানেশনের মাধ্যমে বর্জ্য থেকে মিথেন গ্যাস সংগ্রহ করে পরিবেশদূষণ রোধ ও বিকল্প জ্বালানি উৎপাদন নিশ্চিত করা হবে।
এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, ‘কার্বন ট্রেডিং নিয়ে সরকারের এই ইতিবাচক উদ্যোগ অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। আমিনবাজারের এ প্রকল্প কার্যকর হলে কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনই হবে না, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় স্থায়ী শৃঙ্খলা ফিরবে এবং শহরবাসী চরম দুর্গন্ধ ও দূষণ থেকে রক্ষা পাবে। ল্যান্ডফিল থেকে ক্ষতিকর মিথেন গ্যাস বাতাসে মেশা রোধ করে তা জ্বালানিতে রূপান্তর ঢাকাকে একটি পরিবেশবান্ধব আধুনিক শহরের মডেলে পরিণত করবে।’
kalprakash.com/IM