ইরানের মিনাবে শিশুদের স্কুলে হামলার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার দেশটির হরমোজগান প্রদেশে একটি বিয়েবাড়িতে মার্কিন হামলায় আনন্দঘন মুহূর্ত পরিণত হয়েছে বিভীষিকাময় শোকের রাতে। ধ্বংসস্তূপ থেকে বেঁচে ফেরা প্রত্যক্ষদর্শীদের হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে সেই ধ্বংসযজ্ঞ ও স্বজন হারানোর মর্মস্পর্শী বর্ণনা। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের এক প্রতিবেদনে এই লোমহর্ষক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মরিয়ম মাল্লাহি ও জিয়াউদ্দিন খোশরিশ ভেবেছিলেন জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় রাতটি তাঁরা প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটাবেন। কিন্তু তাঁরা জানতেন না, নিজেদের বিয়ের রাতটিই তাঁদের জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার মুহূর্ত এবং ইরানিদের জন্য চলমান যুদ্ধের অন্যতম বেদনাদায়ক ট্র্যাজেডি হয়ে উঠবে।
গত মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় দক্ষিণ ইরানের হরমোজগান প্রদেশের পূর্ব উপকূলে সিরিক কাউন্টির কুহেস্তাক গ্রামে মরিয়ম ও জিয়াউদ্দিনের বিয়ে উপলক্ষে প্রায় ৩৫০ জন অতিথি উপস্থিত হন। স্থানীয় রীতি অনুযায়ী পুরুষেরা এক আত্মীয়ের বাড়িতে এবং নারীরা কনের পৈতৃক বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। আলোকসজ্জায় সাজানো বাড়িতে সবাই বর-কনের আগমনের অপেক্ষা করছিলেন।
রাত প্রায় ৯টার দিকে যুক্তরাষ্ট্র যখন দক্ষিণ ইরানের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে হামলা চালাচ্ছিল, তখন কুহেস্তাক গ্রামে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। অনুষ্ঠানস্থল থেকে ২০০ মিটারেরও কম দূরত্বে থাকা একটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ারে আঘাত হানার কিছুক্ষণ পরই একটি শক্তিশালী প্রজেক্টাইল ছাদ ভেদ করে কনের বাড়িতে নারীদের জমায়েত হওয়া কক্ষে আঘাত হানে। এতে ছাদ ও মেঝেজুড়ে গভীর গর্ত তৈরি হয় এবং একতলা বাড়িটি সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ৪১ বছর বয়সী মজিদ জানান, পুরুষদের অনুষ্ঠানে থাকার সময় হঠাৎ বিকট শব্দে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে। তিনি কনের বাড়ির দিকে ছুটে গিয়ে দেখেন চারদিকে ধোঁয়া ও আগুন। পরে তিনি ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে নিজের আহত স্ত্রী ও পাঁচ বছর বয়সী সন্তানকে উদ্ধার করেন।
আহত ১৯ বছর বয়সী জাহরা জানান, ঘরের প্রতিটি কার্পেট রক্তে ভিজে গিয়েছিল। অতিথিদের জুতা, খাবার পরিবেশনের বাসন এবং বিয়ের জন্য লাগানো রঙিন বাতিগুলোতেও রক্ত লেগে ছিল। ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার হওয়া মিনা নামের এক নারী জানান, বর-কনের অপেক্ষায় আইসক্রিম খাওয়ার সময় হঠাৎ ছাদ ভেঙে তাঁদের ওপর পড়ে। চারদিক থেকে শুধু বাঁচাও বাঁচাও চিৎকার শোনা যাচ্ছিল।
হামলার পরপরই স্থানীয় বাসিন্দারা ও রেড ক্রিসেন্টের উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে ১৫টি অ্যাম্বুলেন্সে করে হতাহতদের সিরিক ও মিনাবের বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে যায়। ইরানি কর্তৃপক্ষের হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, এ হামলায় চার বছর বয়সী এক শিশুসহ অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন—জারখাতুন তাহেরি (৫০), কোলসুম মাল্লাহি-নেজাদনিয়া (৪৩), মোহাম্মদ মাল্লাহি (১৬), আমির মোহাম্মদ কারিমি (৪) এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া আসিয়েহ মোলায়িনেজাদ (২২)। এছাড়া মোট ৬৮ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৯ জনের বয়স ১০ বছরের নিচে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িটি সম্পূর্ণ বেসামরিক ও আবাসিক এলাকা ছিল এবং এর আশপাশে কোনো সামরিক স্থাপনা ছিল না। এর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মিনাবের শাজারেহ তাইয়েবেহ বালিকা বিদ্যালয়ে চালানো হামলায় ১৫৬ জন নিহত হয়েছিলেন, যাদের অধিকাংশই ছিল শিশু। কুহেস্তাকের এই ঘটনা সেই শোকের স্মৃতিকে নতুন করে ফিরিয়ে এনেছে।
এ বিষয়ে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড দাবি করেছে, তারা ইরানের রাডার ও সামরিক যোগাযোগ স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে এবং বেসামরিক নাগরিকদের ওপর তারা হামলা চালায় না। তবে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন ঘটনাটি তদন্ত করে দেখছে।
এদিকে হামলার সময় বাড়িটিতে দেরিতে পৌঁছানোর কারণে বর-কনে অলৌকিকভাবে বেঁচে গেলেও স্বজন ও ঘনিষ্ঠজনদের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে কনে মরিয়ম গভীর মানসিক ট্রমার মধ্যে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন তাঁর ঘনিষ্ঠরা।
kalprakash.com/IM