সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬ | ১৫ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ১৭ রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ | বিকাল ৫:১২:২৫

গুমের এক যুগ পেরোলেও সন্ধান মেলেনি তেজগাঁও কলেজ ছাত্রদলের দুই নেতার

কাল প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬, ২:৩৯
শেয়ার: mail
গুমের এক যুগ পেরোলেও সন্ধান মেলেনি তেজগাঁও কলেজ ছাত্রদলের দুই নেতার

তেজগাঁও কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি আমিনুল ইসলাম জাকির (বামে) ও তরিকুল ইসলাম ঝন্টু (ডানে)। ছবিঃ সংগৃহীত

বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও সন্ধান মেলেনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের তেজগাঁও কলেজ শাখার গুম হওয়া দুই নেতার। নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন তেজগাঁও কলেজ ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি তরিকুল ইসলাম ঝন্টু ও সাবেক সভাপতি আমিনুল ইসলাম জাকির। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁদের পরিবার এখনো জানে না—তাঁরা কোথায়, কেমন আছেন কিংবা আদৌ বেঁচে আছেন কি না।

২০১৩ সালে গুমের শিকার হন তেজগাঁও কলেজ ছাত্রদলের সহ-সভাপতি তরিকুল ইসলাম ঝন্টু। দীর্ঘ ১৩ বছরেও তাঁর কোনো সন্ধান মেলেনি।

ঝন্টুর ছোট ভাই সাইফুল ইসলাম মিঠু বলেন, ‘ভাই বেঁচে আছেন কি না, সেটাও জানতে পারলাম না। মা বলেন, আমি কি ছেলের রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করব, নাকি ফিরে পাওয়ার জন্য দোয়া করব?’

মিঠু জানান, সম্প্রতি তাঁরা গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনে গিয়েছিলেন। সেখানে তাঁর ভাইয়ের গুম হওয়ার বিষয়ে সাক্ষী হিসেবে ঢাকা মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি মেহেদী হাসান রুয়েলের কথা উল্লেখ করেন তিনি।

মিঠুর বলেন, রুয়েল তাঁকে জানিয়েছিলেন, তিনিও যখন গুমের শিকার হয়ে বরিশালে র‍্যাবের একটি ‘আয়নাঘরে’ ছিলেন, তখন সেখানকার দেয়ালে তরিকুল ইসলাম ঝন্টুর নাম, তেজগাঁও কলেজ এবং তাঁর ফোন নম্বর লেখা দেখতে পেয়েছিলেন।

এই তথ্যের ভিত্তিতে বরিশালের র‌্যাব কার্যালয়ের ‘আয়নাঘর’ তল্লাশি এবং সেখানে ওই সময় কর্মরত ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গুম কমিশনের কাছে অনুরোধ করা হলেও তেমন সাড়া পাননি বলে দাবি করেন মিঠু। তাঁর ভাষ্য, কমিশন তাঁদের পুলিশের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

গুমের অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে অধ্যাদেশের খসড়া অনুমোদনের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে মিঠু বলেন, আইন শুধু কাগজে-কলমে রাখলে কোনো লাভ হবে না। এটাকে কার্যকর করতে হবে। তাহলে এই জঘন্য অপরাধ করার সাহস কেউ পাবে না।

গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ক্ষতিপূরণ দিলে তো স্বজনদের ফিরে পাওয়া যাবে না। আর কত ক্ষতিপূরণ দেবে? যদি দেওয়া হয়, তাহলে যেন একটি পরিবার স্বচ্ছন্দে চলার মতো হয়। তবে সবার আগে রাষ্ট্রকে স্বীকার করতে হবে যে, গুমের শিকার ব্যক্তি আর বেঁচে নেই। তাঁদের সেই সনদ দিতে হবে।

 

২০১৫ সালের ৭ এপ্রিল গুমের শিকার হন তেজগাঁও কলেজ ছাত্রদলের তৎকালীন সভাপতি আমিনুল ইসলাম জাকির। তিনি গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার জাঙ্গালিয়া ইউনিয়নের ছাতিয়ানী গ্রামের মৃত আবুল হোসেনের ছেলে।

ছেলে হারিয়ে ৭২ বছর বয়সী মা আকলিমা খাতুন এখনো অপেক্ষায় আছেন। তিনি জানান, ১৯৯৪ সালের জানুয়ারিতে তাঁর স্বামী মারা যাওয়ার পর চার ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে কোনোরকমে সংসার চালিয়ে আসছিলেন। এর মধ্যে ২০১৫ সালের ৭ এপ্রিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা গুলশান-২ এলাকা থেকে তাঁর ছেলে জাকিরকে তুলে নিয়ে যায় বলে তাঁর অভিযোগ।

এরপর কেটে গেছে ১১ বছর। কিন্তু ছেলের কোনো সন্ধান পাননি তিনি।

আকলিমা খাতুন বলেন, রাতে ঘুমাতে গেলে আমার চোখে ঘুম আসে না। মনে হয়, আমার সন্তান আমাকে মা মা বলে ডাকছে। ছেলে হারানোর বেদনা আর সইতে পারছি না। তার কথা মনে হলে আমি আর স্থির থাকতে পারি না। আপনারা আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দিতে পারবেন? আমার ছেলেটাকে এনে দেন।

স্বজন হারানো এই পরিবার এখনো জানে না তাঁদের প্রিয় মানুষটি কোথায় আছেন। তিনি বেঁচে আছেন কি না, সেই উত্তরও অজানা। আন্তর্জাতিক গুম দিবস এলেই পরিবারের সদস্যদের মনে নতুন করে জাগে—হয়তো প্রিয় মানুষটি কোথাও বেঁচে আছেন। সেই আশায় পথের দিকে তাকিয়ে থাকেন মা আকলিমা খাতুন ও পরিবারের অন্য সদস্যরা।

সরকারের কাছে আকলিমা খাতুনের দাবি, আমার ছেলের মতো গুম হওয়া সব নেতাকর্মীকে অবিলম্বে তাঁদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিন। নয়তো বলুন, তাঁরা আর নেই।

 

২০১৫ সালে গুমের শিকার হয়েছিলেন তেজগাঁও কলেজ ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বেলাল হোসেন। পরে তিনি মুক্তি পেলেও সেই ঘটনার ভয়াবহ মানসিক ট্রমা এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন।

বেলাল হোসেন বলেন, যারা গুমের শিকার হয়ে বেঁচে ফিরেছেন, তারা ট্রমার মধ্যে আছেন। আর যারা ফেরেননি, তাঁদের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা একমাত্র আল্লাহ জানেন আর যারা গুম করেছিল তারা জানে।

গুমের সময়কার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি বলেন, সেখানে যে কদিন রাখা হয়েছে, সেই দিনগুলো যেন জাহান্নামের ভেতরে ছিলাম। প্রতিটি সেকেন্ড কেটেছে মৃত্যুভয়ে।

এই ঘটনার জন্য দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে বেলাল বলেন, গুমের মতো ভয়াবহ অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ কমতে পারে।

 

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পরও দুই বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু তেজগাঁও কলেজ ছাত্রদলের গুম হওয়া নেতাদের বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে পরিবারের সদস্যদের দাবি।

এ অবস্থায় গুম হওয়া সহযোদ্ধাদের দ্রুত উদ্ধার, তাঁদের অবস্থান নিশ্চিত করা এবং পরিবারগুলোর কাছে প্রকৃত তথ্য তুলে ধরার দাবি জানিয়েছেন তেজগাঁও কলেজ ছাত্রদলের সাবেক ও বর্তমান নেতৃবৃন্দ।

পরিবারগুলোর দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে তাঁদের প্রিয়জনদের বিষয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশের দাবি এখন আরও জোরালো হচ্ছে।

kalprakash.com/IM

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সব দেখুন arrow_forward
Logo
সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬ | Globe kalprakash.com

গুমের এক যুগ পেরোলেও সন্ধান মেলেনি তেজগাঁও কলেজ ছাত্রদলের দুই নেতার

বিস্তারিত কমেন্টে