রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬ | ১৪ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ১৬ রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ | সকাল ১০:৩৭:৪৮

নেপালের ভোতেকোশী নদীর পাহাড়ি ঢলে বেঁচে ফেরা ৭ জনের লোমহর্ষক অভিজ্ঞতা

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৪৬
শেয়ার: mail
নেপালের ভোতেকোশী নদীর পাহাড়ি ঢলে বেঁচে ফেরা ৭ জনের লোমহর্ষক অভিজ্ঞতা

কাল প্রকাশ। ছবি: সংগৃহীত

কয়েক মিনিটের ব্যবধানে বদলে যায় সবকিছু। কেউ দৌড়ে উঠেছেন পাহাড়ে, কেউ ছুটেছেন বনের দিকে, আবার কেউ বন্যার স্রোতের চেয়ে দ্রুত গতিতে গাড়ি চালিয়ে প্রাণে বেঁচেছেন। একজন তো জীবন বাঁচাতে আঁকড়ে ধরেছিলেন বিদ্যুতের তার। কিন্তু প্রাণে ফিরলেও চোখের সামনে বসতি, ঘরবাড়ি ও স্বজনদের হারানোর সেই দৃশ্য এখনো তাদের তাড়া করে ফিরছে।

গত বুধবার সকালে নেপালের ভোতেকোশী নদীতে ভয়াবহ পাহাড়ি ঢল নামার পর এমনই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন অনেকে। কেউ নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সময় পেয়েছেন, আবার অনেকেই সেই সুযোগটুকুও পাননি। বন্যার স্রোতে মুহূর্তের মধ্যে ভেসে গেছে একের পর এক জনপদ, হারিয়ে গেছেন বহু মানুষ।

নেপালের সংবাদমাধ্যম কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদনে বেঁচে ফেরা সাতজনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। তাদের প্রত্যেকের বেঁচে ফেরার গল্প আলাদা হলেও ভয়াবহতার স্মৃতি প্রায় একই।

বিদ্যুতের তার ধরে প্রাণে বাঁচেন রামবাচন সাহ ৩৬ বছর বয়সী রামবাচন সাহ প্রায় ১৫ বছর ধরে সেতুর কাছে শ্যাম মিষ্টির দোকানে কাজ করতেন। বুধবার সকালে দোকানে মিষ্টি তৈরির সময় হঠাৎ বন্যার পানি ঢুকে পড়ে। প্রবল স্রোতে ভেসে যাওয়ার সময় তাঁর হাত একটি বিদ্যুতের তারে আটকে যায়। এরপর প্রায় আধা ঘণ্টা সেই তার আঁকড়ে ঝুলে থেকে জীবন বাঁচান তিনি।

রামবাচন সাহ বলেন, নিজেকে বাঁচানোর আর কোনো উপায় না দেখে তিনি পাশের একটি বিদ্যুতের তার ধরে ফেলেন। প্রায় আধা ঘণ্টা জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানে ঝুলে ছিলেন তিনি। হাত ফসকে গেলে বেঁচে ফেরার কোনো সুযোগ ছিল না।

তবে প্রাণে বাঁচলেও তাঁর সঙ্গে থাকা তিনজনের এখনো কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। তাঁরা হলেন সঙ্গীতা, তাঁর ছেলে রাহুল এবং আরেক কর্মী বিনোদ ভগত। বন্যার পর এক বন্ধুর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন সাহ। তিনি জানান, শরীরে হয়তো এখনো বন্যার কাদার চিহ্ন রয়েছে, তবে সেই সকালের আতঙ্ক এখনো তাঁর মনে পুরোপুরি তাজা।

স্বজনদের হারিয়ে বেঁচে আছেন সচিন খাতি সচিন খাতি বেঁচে গেছেন মূলত বন্যার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকায়। তবে তাঁর মামার পুরো পরিবার এখনো নিখোঁজ। স্থানীয় বাসিন্দা রাজ কুমার দিয়ালি ১৫ বছর ধরে রাসুয়ার স্যাব্রুবেশি ৫ নম্বরে গয়নার ব্যবসা করছিলেন। স্ত্রী শ্রিতি ও চার বছরের ছেলে শ্রীরাজকে নিয়ে সেখানেই থাকতেন তিনি। সচিনও তাঁদের সঙ্গে থেকে ব্যবসায় সহযোগিতা করছিলেন।

বুধবার সকালে রাজ কুমার কাজের প্রয়োজনে সচিনকে চিলিমেতে পাঠান। পরে বন্যার খবর পেয়ে সচিন দ্রুত ফিরে আসেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখেন, যে বসতিতে তাঁরা থাকতেন সেটিই বন্যার স্রোতে ভেসে গেছে।

সচিন বর্তমানে নেপালি সেনাবাহিনীর নিরাপত্তায় ধুনচেতে রয়েছেন। তাঁর মামা রাজ কুমার, মামি শ্রিতি এবং তাঁদের চার বছরের ছেলে শ্রীরাজের এখনো কোনো সন্ধান মেলেনি। রাজ কুমারের ভাগ্নি রাধা খাতি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, জীবিত অবস্থায় খুঁজে না পেলেও অন্তত তাঁদের মরদেহ যেন পাওয়া যায়। পুরো পরিবার তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছে। জেলা পুলিশ জানিয়েছে, কাজ, ব্যবসা বা চাকরির জন্য রাসুয়ায় যাওয়া জেলার ১৩ জনের সঙ্গে বন্যার পর থেকে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না।

বন্যার আগে গাড়ি ছুটিয়ে প্রাণে বাঁচেন রাজ কুমার স্থানীয় এলাকার বাসিন্দা রাজ কুমার কার্কি বন্যার স্রোতের সামনে থেকে গাড়ি চালিয়ে কোনোমতে প্রাণে বেঁচেছেন। মঙ্গলবার তিনি নুয়াকোটের বেত্রাবতিতে পৌঁছেছিলেন। পরদিন সকালে পণ্য নেওয়ার জন্য তিমুরের দিকে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ঠিক তখনই মাইকে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়, বন্যা আসছে।

কার্কি দ্রুত তাঁর কনটেইনার ট্রাক ঘুরিয়ে গালছির দিকে যেতে শুরু করেন। কিছুক্ষণ পরই তিনি দেখতে পান, বিশাল স্রোত তাঁর দিকে ধেয়ে আসছে। তখন তিনি গাড়ির গতি আরও বাড়িয়ে দেন। তাঁর সামনে থাকা কয়েকটি গাড়ি ও চালক বন্যার স্রোতে ভেসে যায়। তাঁদের মধ্যে কিরণ ভুজেলের চালানো আরেকটি কনটেইনার ট্রাকও ছিল।

কার্কি বলেন, বন্যার স্রোত ঠিক পেছনে রেখে তিনি যত দ্রুত সম্ভব গাড়ি চালিয়ে পালাচ্ছিলেন। তাঁর পেছনে থাকা প্রায় নয়টি কনটেইনার ট্রাক ও সেগুলোর চালক স্রোতে ভেসে যায়। গাড়ির সাইড মিররে পেছনে ধেয়ে আসা বন্যার পানি দেখতে দেখতে তিনি ত্রিশূলির ধুংগে বাজারে পৌঁছানোর আগে ট্রাকটি পাহাড়ের দিকে তুলে দেন। এতে তাঁর জীবন ও ট্রাক দুটিই রক্ষা পায়।

সেই রাতে পাহাড়ের ওপর থেকে তিনি বেত্রাবতি ও আশপাশের বসতি ধ্বংস হতে দেখেন। শহরের বড় একটি অংশ নদীর তলদেশে পরিণত হয় এবং তাঁর পরিচিত মানুষদের ত্রিশূলী নদীতে ভেসে যেতে দেখেন তিনি। বৃহস্পতিবার নিরাপত্তাকর্মীদের সহায়তায় কাঠমান্ডু পৌঁছান কার্কি। শুক্রবার তিনি নিজ বাড়িতে ফিরে যান।

পাহাড়ে দৌড়ে উঠে বাঁচেন গাথে কামি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাছে কাজ করছিলেন স্যাল্যানের গাথে কামি। বুধবার সকালে হঠাৎ পাহাড় থেকে পাথর গড়িয়ে পড়ার মতো বিকট শব্দ শুনতে পান তিনি। এরপরই দেখতে পান ভোতেকোশী নদীর পানি অস্বাভাবিক গতিতে এগিয়ে আসছে।

৪০ বছর বয়সী কামি সবাইকে দৌড়াতে বলেন এবং নিজেও প্রায় ৫০০ মিটার উঁচু বনাঞ্চলের দিকে ছুটে যান। দৌড়ানোর সময় তাঁর হৃদস্পন্দন বেড়ে যায় এবং একপর্যায়ে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। জ্ঞান ফেরার পর তিনি দেখতে পান, নিচের পুরো বসতি মাটির নিচে চাপা পড়ে গেছে।

কামি বলেন, তখনই তিনি বুঝতে পারেন যে বেঁচে গেছেন। পুরো ঘটনাটি এখনো তাঁর কাছে স্বপ্নের মতো মনে হয়। শৈশবে পাহাড়ে গরু ও ছাগল চরানোর সময় খাড়া পাহাড়ে দৌড়ানোর অভিজ্ঞতা সেদিন তাঁকে বাঁচাতে সাহায্য করেছে বলেও জানান তিনি।

বনের দিকে দৌড়ে বাঁচেন রাজু বুধাথোকি কাস্টমস এজেন্ট রাজু বুধাথোকি বুধবার তিমুরেতে নিজের কক্ষে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে হঠাৎ পাহাড় কাঁপতে শুরু করলে তাঁর ঘুম ভেঙে যায়। রাজু বলেন, পুরো পাহাড় এমনভাবে কাঁপছিল যেন ভূমিকম্প হয়েছে। জীবন বাঁচাতে তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে দৌড় দেন।

তিনি একটি পুলিশ পোস্টের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু দেখেন, পুলিশ সদস্যরাও সেখান থেকে পালাচ্ছেন। পেছনে ফিরে তাকিয়ে তিনি দেখতে পান, তিমুরের ঘরবাড়ি বন্যার পানিতে ভেঙে পড়ছে। কিছু বাড়িঘর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ত্রিশূলী নদীতে হারিয়ে যায়। পরে তিনি বসতি থেকে প্রায় ৫০০ মিটার উঁচু বনের মধ্যে পৌঁছে শেষ পর্যন্ত প্রাণে বাঁচেন।

নতুন জীবন নিয়ে ফিরেছেন প্রকাশ গৌতম কাঠমান্ডুর গোকর্ণেশ্বরের বাসিন্দা প্রকাশ গৌতমও বুধবার তিমুরেতে ছিলেন। হঠাৎ বিকট শব্দে পুরো বসতি কেঁপে ওঠে। গৌতম বলেন, মুহূর্তের মধ্যে চারপাশ অন্ধকার হয়ে যায় এবং আকাশ কালো মেঘে ঢেকে যায়। কোথায় যাবেন তা না জেনেই তিনি দৌড়াতে শুরু করেন।

পালানোর সময় বাঁ পায়ের কনিষ্ঠ আঙুলে আঘাত পান তিনি। পরে বনের পাহাড়ি অংশে উঠে সেখান থেকে দেখেন, বন্যার পানিতে মানুষের মরদেহ ভেসে যাচ্ছে। তিমুরের পুরো বসতি ধ্বংস হয়ে গেছে। বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে একটি সেনা হেলিকপ্টারে তাঁদের বিদুরে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রকাশ বলেন, তিনি যেন এক নতুন জীবন ফিরে পেয়েছেন।

বন্যার ঢেউয়েই প্রাণ বাঁচল তুলসী বাহাদুরের তুলসী বাহাদুর ভান্ডারি রাসুয়ার একটি বসতিতে থাকা অবস্থায় হঠাৎ বন্যার মুখে পড়েন। কালো কাদা ও পানির প্রবল স্রোত যখন বসতির ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল, তখন একটি শক্তিশালী ঢেউ তাঁকে পাহাড়ের দিকে ছুড়ে দেয়।

তুলসী বাহাদুর বলেন, হঠাৎ ভবনগুলো ভেঙে পড়তে শুরু করে। কালো কাদা ও পানির তীব্র স্রোত কোথা থেকে এলো তা বোঝার সুযোগ ছিল না। তিনি দৌড়ানোর চেষ্টা করলেও বন্যার পানির তোড় তাঁকে ধরে ফেলে। এরপর একটি ঢেউ তাঁকে প্রচণ্ড আঘাত করে পাশের পাহাড়ে আছড়ে ফেলে। ওই ঢেউ তাঁকে পাহাড়ের দিকে না ছুড়লে তিনি বাঁচতেন না। স্রোতে ভেসে না গিয়ে পাশে ছিটকে পড়ায় অলৌকিকভাবে তাঁর জীবন রক্ষা পায়।

প্রাণে বাঁচলেও তাড়া করছে দুঃসহ স্মৃতি নেপালের ভোতেকোশী নদীর পাহাড়ি ঢল থেকে এই সাতজন বেঁচে ফিরলেও তাঁদের সামনে এখন নতুন এক লড়াই। বেঁচে ফেরার স্বস্তির সঙ্গে মিশে আছে স্বজন হারানোর বেদনা এবং চোখের সামনে দেখা ধ্বংসযজ্ঞের ভয়াল স্মৃতি। কেউ বিদ্যুতের তার আঁকড়ে ধরে, কেউ পাহাড়ে উঠে, কেউ বনের দিকে ছুটে কিংবা কেউ বন্যার স্রোতের সামনে গাড়ি চালিয়ে প্রাণে বেঁচেছেন। কিন্তু তাঁদের প্রত্যেকের মনে এখনো তাজা সেই কয়েক মিনিটের ভয়াল সময়, যখন চোখের সামনে নিজেদের ঘরবাড়ি ও পুরো জনপদ পানির অতলে হারিয়ে যেতে দেখেছেন তাঁরা।

সূত্র: কাঠমান্ডু পোস্ট অবলম্বনে বাংলাদেশ প্রতিদিন

kalprakash.com/IM

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সব দেখুন arrow_forward
Logo
রোববার, ৩০ আগস্ট ২০২৬ | Globe kalprakash.com

নেপালের ভোতেকোশী নদীর পাহাড়ি ঢলে বেঁচে ফেরা ৭ জনের লোমহর্ষক অভিজ্ঞতা

বিস্তারিত কমেন্টে