নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, লোকসংস্কৃতি ও ধর্মীয় স্মৃতির নানা উপাদান ছড়িয়ে রয়েছে এ অঞ্চলের বিভিন্ন প্রাচীন স্থাপনায়। পদ্মা নদীর শাখা বড়াল নদ থেকে উৎপন্ন বর্তমানে বিলুপ্তপ্রায় একটি নদী একসময় এ অঞ্চলের ভূগোল, অর্থনীতি ও গ্রামীণ জীবনযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। সেই নদীকেন্দ্রিক জনপদের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে প্রায় তিনশত বছরের পুরোনো একটি প্রাচীন স্থাপনা—‘আবদালের মসজিদ’। তবে দীর্ঘদিনের অযত্ন ও অবহেলায় ঐতিহাসিক এই মসজিদটি আজ প্রায় বিস্মৃত এক প্রত্নতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছে।
লোকমুখে প্রচলিত তথ্য ও স্থানীয় ইতিহাস সূত্রে জানা যায়, বড়াল নদ থেকে উৎপন্ন নদীটি একসময় বাগাতিপাড়া অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতো। নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল একটি সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক ধারা। এ অঞ্চলে তখন প্রচুর পরিমাণে শামুক ও ঝিনুক পাওয়া যেত। এসব শামুক-ঝিনুক পুড়িয়ে তৈরি করা হতো উন্নতমানের চুন, যা প্রাচীন বাংলার দালানকোঠার গাঁথুনি, প্লাস্টার এবং অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যবর্ধনের অন্যতম প্রধান উপাদান ছিল।
ঝিনুক ও শামুক থেকে চুন উৎপাদনকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলে একটি বিশেষ শ্রমজীবী শিল্প গড়ে ওঠে। এই শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল ‘আবদাল’ নামের একটি পেশাভিত্তিক মুসলিম সম্প্রদায়। আধ্যাত্মিক অর্থে ‘আবদাল’ বলতে সাধক শ্রেণির মানুষকে বোঝানো হলেও এ অঞ্চলের প্রেক্ষাপটে এটি চুন উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত জনগোষ্ঠীকেই নির্দেশ করত।
বাগাতিপাড়া উপজেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য গবেষক (অবসরপ্রাপ্ত উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা) আজিজুর রহমানের তথ্যসূত্র অনুযায়ী, প্রায় তিনশত বছর আগে বাংলায় নবাবি আমলের প্রতিষ্ঠাতা নবাব মুর্শিদকুলী খাঁর শাসনামলে (১৭০০–১৭২৭ খ্রিষ্টাব্দ) বাগাতিপাড়া উপজেলার চকমাহাপুর গ্রামে নদীর তীর ঘেঁষে আবদাল সম্প্রদায়ের মানুষ এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। তৎকালীন গ্রামীণ স্থাপত্যের বিবেচনায় মসজিদটির নির্মাণকৌশল ও শৈলী ছিল অত্যন্ত উন্নতমানের। ফলে স্থানীয়দের কাছে এটি ধীরে ধীরে ‘আবদালের মসজিদ’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
কালের পরিক্রমায় নদ-নদী ভরাট হয়ে গেলে শামুক ও ঝিনুকের প্রাপ্যতা কমে যায় এবং একপর্যায়ে ঐতিহ্যবাহী চুনশিল্পটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। জীবিকার তাগিদে আবদাল সম্প্রদায়ের মানুষেরা অন্য পেশা বেছে নেন এবং এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। জনগোষ্ঠীর বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে তাদের নির্মিত মসজিদটিও অযত্নে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে জঙ্গলে ঢেকে যায়।
স্থানীয় বা সরকারি পর্যায়ে এখন পর্যন্ত প্রাচীন এই স্থাপত্যটি সংরক্ষণে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব বহনকারী নিদর্শনটি ধীরে ধীরে ইতিহাসের অন্তরালে হারিয়ে যেতে বসেছে। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা ও দ্রুত সংস্কারের মাধ্যমে ‘আবদালের মসজিদ’ সংরক্ষণ করা এখন সময়ের দাবি।
kalprakash.com/IM