বাংলা ভাষা, লোকসংস্কৃতি ও প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা চিরচেনা পাখি ‘কাক’ আজ আমাদের চারপাশ থেকে নিঃশব্দে হারিয়ে যেতে বসেছে। ‘কাকতালীয়’, ‘কাকজ্যোৎস্না’, ‘কাকভূষণ্ডী’, ‘কাকচক্ষু জল’ কিংবা ‘কাকনিদ্রা’র মতো অজস্র শব্দ ও বাগধারা যে পাখির ওপর ভর করে বাংলা সাহিত্যে স্থান করে নিয়েছে, সেই অতি পরিচিত পাখিটির উপস্থিতি এখন শহর ও গ্রাম—উভয় অঞ্চলেই আশঙ্কাজনক হারে কমছে।
লোকগাথা ও পৌরাণিক উপাখ্যানে পাতিকাক ও দাঁড়কাকের বিস্তর উল্লেখ মেলে। গ্রামীণ জীবনের ফসলের ক্ষেতে ‘কাকতাড়ুয়া’ স্থাপন থেকে শুরু করে শহুরে জীবনে কাকভোরে কর্কশ ডাকে ঘুম ভাঙা—বাঙালির জীবনযাত্রায় কাক ছিল নিত্যসঙ্গী। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের অবিস্মরণীয় দুর্ভিক্ষের চিত্রেও কাক জায়গা করে নিয়েছিল অন্যতম প্রধান প্রতীক হিসেবে।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় কাককে বলা হয় প্রকৃতির স্বাভাবিক ‘ঝাড়ুদার’। পচনশীল আবর্জনা ও উচ্ছিষ্ট খেয়ে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে কাকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে যেভাবে প্রকৃতির মেথর হিসেবে পরিচিত শকুনের দল আজ প্রায় বিলুপ্তির প্রান্তে এসে ঠেকেছে, কাকের বর্তমান অবস্থাও সেই চরম পরিণতির দিকেই ইঙ্গিত করছে। একসময় শহরের বৈদ্যুতিক তারে, ডাস্টবিনে কিংবা দেয়ালের কার্নিশে ঝাঁকে ঝাঁকে কাকের বিচরণ দেখা গেলেও এখন আর সেই চিরচেনা দৃশ্য চোখে পড়ে না।
বর্তমানে দেশে পাখিপ্রেমী ও পরিবেশবাদী কার্যক্রম বৃদ্ধি পেলেও কাকের এই নীরব বিলুপ্তির বিষয়টি এখনও সার্বিক নজরদারির বাইরে রয়ে গেছে। পরিবেশের বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখতে কাকের মতো অতি পরিচিত পাখির অস্তিত্ব রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। এখনই এ বিষয়ে সচেতন না হলে হয়তো অচিরেই এই পাখিটিকেও কেবল বইয়ের পাতা ও শিল্পকর্মের মাঝেই খুঁজে নিতে হবে।
kalprakash.com/IM