বিএনপির নেতৃত্বে সরকার গঠনের মাত্র তিন মাসের মাথায় পদত্যাগ করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। আনুষ্ঠানিকভাবে শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখানো হলেও রাজনৈতিক অঙ্গন ও দলীয় মহলে এ পদত্যাগ নিয়ে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা তৈরি হয়েছে।
পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই গেজেট প্রকাশ হওয়ায় বিষয়টি আরও গুরুত্ব পায়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো ইঙ্গিত করছে, এটি স্বাভাবিক পদত্যাগ নয়; বরং মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ এবং রাজনৈতিক চাপের ফল।
রাঙামাটি আসন থেকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে প্রথমবারের মতো পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন দীপেন দেওয়ান। দায়িত্ব গ্রহণের পর স্থানীয় পর্যায়ে প্রত্যাশা তৈরি হলেও খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সেই প্রত্যাশা ভেঙে যায় তার পদত্যাগের মধ্য দিয়ে।
পদত্যাগের কারণ হিসেবে অসুস্থতার কথা উল্লেখ থাকলেও বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, তিনি নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছিলেন এবং প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। ফলে অসুস্থতার বিষয়টি নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে নীতিনির্ধারণ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং উন্নয়ন কার্যক্রম নিয়ে মতবিরোধ চলছিল। অভিযোগ রয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে মন্ত্রীর বাইরে থেকেও হস্তক্ষেপ হচ্ছিল। উন্নয়ন প্রকল্প, আর্থিক বরাদ্দ, কর্মকর্তা নিয়োগ ও বদলি—এসব ক্ষেত্রেও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা ছিল।
প্রশাসনিক কার্যক্রমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মন্ত্রণালয়ের ফাইল প্রক্রিয়াতেও বাধা সৃষ্টি হয় বলে জানা গেছে। এতে মন্ত্রণালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং মন্ত্রীর অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে।
পদত্যাগের পরপরই নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ আচরণ ও প্রোটোকল নিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, মীর হেলাল সাংবিধানিক আচরণ ভঙ্গ করে তার প্রতিমন্ত্রীর নিজস্ব অফিস কক্ষ ব্যবহার না করে সাবেক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের অফিস কক্ষে মন্ত্রীর চেয়ারে বসে রাঙামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি দীপেন তালুকদার দিপু, কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এস এম জিলানী, যুগ্ম সম্পাদক মোরশেদ আলম, বান্দরবানের সাবেক পৌর মেয়র জাবেদ রেজাসহ আরও কয়েকজনকে নিয়ে বৈঠক পরিচালনা করেন।
একই সঙ্গে অভিযোগ উঠেছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড এবং রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য পদ দখলকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়ে জোর লবিং চালানো হচ্ছে।
এদিকে প্রশ্ন উঠেছে, মীর হেলাল প্রতিমন্ত্রী এবং তার নিজস্ব আলাদা অফিস কক্ষ রয়েছে। তবুও তিনি তার নিজস্ব অফিস কক্ষে বৈঠক না করে কোন ক্ষমতাবলে পার্বত্যবিষয়ক মন্ত্রীর সাংবিধানিক পদের চেয়ারে বসে তার কক্ষে বৈঠক করেন? এ ঘটনাকে প্রশাসনিক শিষ্টাচারবহির্ভূত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এ নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে যে, মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের পেছনে প্রতিমন্ত্রী মীর হেলালের ভূমিকা থাকতে পারে।
অপরদিকে রাঙামাটি জেলা পরিষদ পুনর্গঠন এবং নেতৃত্ব নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক টানাপোড়েন ক্রমেই তীব্র আকার ধারণ করে। এই দ্বন্দ্বই শেষ পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সংকটকে চরম পর্যায়ে নিয়ে যায়।
বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এটি শুধুমাত্র একজন মন্ত্রীর পদত্যাগের ঘটনা নয়; বরং সরকারের ভেতরে বিদ্যমান বৃহত্তর ক্ষমতার দ্বন্দ্বের প্রতিফলন। বর্তমানে একাধিক মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের মধ্যে মতবিরোধ বিদ্যমান।
সরকারের ৪৩টি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মন্ত্রণালয়ে একাধিক ক্ষমতার কেন্দ্র তৈরি হওয়ায় প্রশাসনিক সমন্বয় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় অস্থিরতা দেখা দিচ্ছে।
দলীয় অভ্যন্তরে বিভিন্ন গ্রুপের প্রভাব বিস্তার নিয়েও উত্তেজনা বাড়ছে। একাধিক প্রভাবশালী গোষ্ঠীর মধ্যে প্রতিযোগিতা সরকারের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে শিগগিরই মন্ত্রিসভায় রদবদলের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। একাধিক মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পরিবর্তন হতে পারে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
সরকার গঠনের প্রাথমিক সময়েই এমন অস্থিরতা ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের ঘটনাটি সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
kalprakash.com/SAS
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















