বাংলাদেশ ০৯:২২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬
শিরোনামঃ
Logo পাবনায় রিয়া হত্যা মামলার ৩ অভিযুক্ত গ্রেপ্তার: গুম করার কাজে ব্যবহৃত প্রাইভেটকার জব্দ Logo শেষ মুহূর্তের গোলে নেপালকে হারিয়ে টানা তৃতীয়বার সাফের ফাইনালে বাংলাদেশ Logo ইরানের বিরুদ্ধে উপসাগরীয় দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান আমিরাতের Logo অর্থনৈতিক সংস্কারে নতুন সহায়তা চেয়ে আইএমএফের দ্বারস্থ বাংলাদেশ Logo মমতা ব্যানার্জীর দল তৃণমূল কংগ্রেস কি ভাঙনের দিকে এগোচ্ছে? Logo অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে দেখা করলেন সাগর-রুনির সন্তান মেঘ Logo গ্রাহক পর্যায়ে প্রতি ইউনিটে কত বাড়ল বিদ্যুতের দাম? Logo যুগ্মসচিবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত Logo নড়বড়ে কাঠের সাঁকোই ভরসা, দুর্ভোগে চরাঞ্চলের ২০ হাজার মানুষ Logo খানজাহান আলীর দিঘির শেষ কুমির অপসারণ, সাড়ে ৬শ বছরের ঐতিহ্যের অবসান

নড়বড়ে কাঠের সাঁকোই ভরসা, দুর্ভোগে চরাঞ্চলের ২০ হাজার মানুষ

ভোরের আলো পুরোপুরি ফোটার আগেই তিস্তার শাখা নদীর ওপর নির্মিত নড়বড়ে কাঠের সাঁকোটিতে শুরু হয় মানুষের চলাচল। কেউ মাথায় সবজির ঝুড়ি, কেউ কাঁধে ধান বা ভুট্টার বস্তা, আবার কেউ বই-খাতা ভর্তি স্কুলব্যাগ নিয়ে সাবধানে পার হচ্ছে। বৃদ্ধরা লাঠিতে ভর দিয়ে এগিয়ে যান, আর ছোট শিশুরা ভয়ে মায়ের হাত শক্ত করে ধরে সাঁকো পার হয়। নিচে ঘোলা পানি, ওপরে মেঘলা আকাশ—মাঝখানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিনের পথচলা।

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বেলকা ইউনিয়নের কিশামত সদর ও বেলকা নবাবগঞ্জ গ্রামের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে তিস্তা নদীর একটি শাখা। মাত্র ১২০ ফুট দৈর্ঘ্যের এই নদীই দুই পাড়ের প্রায় ২০ হাজার মানুষের জীবনে দীর্ঘদিন ধরে দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একপাশে বসতি, অন্যপাশে হাট-বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসাকেন্দ্র ও জীবিকার বিভিন্ন ক্ষেত্র।

দীর্ঘ প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে নদী পারাপারের একমাত্র ভরসা ছিল ছোট নৌকা। বর্ষা মৌসুমে নদীর স্রোত বেড়ে গেলে অনেক সময় নৌকা চলাচলও বন্ধ হয়ে যেত। ফলে দুই পাড়ের মানুষ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তেন।

সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়তেন শিক্ষার্থীরা। স্কুল-কলেজে যাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ত। জরুরি রোগীদের হাসপাতালে নিতে বিলম্ব হতো। কৃষকরাও সময়মতো ফসল বাজারজাত করতে না পেরে ক্ষতির মুখে পড়তেন।

এ অবস্থায় ২০১৭ সালে বেলকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ইব্রাহিম খলিলুল্যাহ নিজ উদ্যোগে নদীর ওপর প্রায় ১২০ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি কাঠের সাঁকো নির্মাণ করেন। পরে ইউনিয়ন পরিষদের বরাদ্দ ও তৎকালীন সংসদ সদস্যের সহযোগিতায় সাঁকোটির বিভিন্ন অংশ সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়।

সাঁকো নির্মাণের ফলে চরাঞ্চলের মানুষের যাতায়াত কিছুটা সহজ হয়। কৃষকরা দ্রুত ফসল বাজারে নিতে পারেন, ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড বাড়ে এবং শিক্ষার্থীদের নিয়মিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হয়।

তবে কাঠ ও বাঁশের তৈরি এই অস্থায়ী সাঁকোটি প্রতিবছরই মেরামত করতে হচ্ছে। ২০২০ সালের ভয়াবহ বন্যায় এটি পুরোপুরি ভেঙে গেলে কয়েক মাস চরম দুর্ভোগে পড়েন এলাকাবাসী। পরে নতুন করে সাঁকো নির্মাণ করা হলেও স্থায়ী সমাধান মিলেনি।

সম্প্রতি টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে নদীতে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই সঙ্গে ভেসে আসা বিপুল কচুরিপানা সাঁকোর নিচে জমে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে সাঁকোটির বিভিন্ন অংশ বেঁকে গেছে, কোথাও কাঠ পচে নরম হয়ে পড়েছে, আবার কোথাও বাঁশ আলগা হয়ে দুলছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

স্থানীয়রা জানান, প্রতিদিনই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। কেউ পিছলে পড়ে আহত হচ্ছেন, কেউ সাইকেলসহ নদীতে পড়ে যাচ্ছেন। তারপরও বিকল্প পথ না থাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে।

স্কুলছাত্র মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, “প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে যেতে হয়। বর্ষাকালে সাঁকো আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। একটি স্থায়ী সেতু হলে আমাদের দুর্ভোগ অনেকটাই কমে যাবে।”

কৃষক আমজাদ আলী বলেন, “একটি সেতু হলে কৃষকরা সরাসরি বাজারে যেতে পারত। এতে আমরা ফসলের ন্যায্য দাম পেতাম।”

স্থানীয় ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম বলেন, “মালামাল আনা-নেওয়ায় অতিরিক্ত খরচ হয়। একটি সেতু হলে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসবে।”

পল্লী চিকিৎসক শিহাব মো. শাহাবুদ্দিন বলেন, “জরুরি রোগী হাসপাতালে নিতে অনেক সময় নষ্ট হয়। একটি সেতু হলে স্বাস্থ্যসেবা সহজ হবে।”

ইউপি সদস্য মো. হাফিজার রহমান বলেন, “কাঠের সাঁকো কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। একটি সেতু নির্মাণ হলে শিক্ষা, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্বাস্থ্যসেবায় বড় পরিবর্তন আসবে।”

বেলকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ইব্রাহিম খলিলুল্যাহ বলেন, “প্রতিবছর সাঁকো সংস্কার করা হলেও বন্যা ও কচুরিপানার চাপে এটি আবার নাজুক হয়ে পড়ে। স্থায়ী সমাধানের জন্য সেতু নির্মাণ জরুরি।”

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) তপন কুমার চক্রবর্তী বলেন, “ওই স্থানে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্প অনুমোদন পেলেই বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”

এলাকাবাসীর দাবি, স্বাধীনতার এত বছর পরও একটি সেতুর অভাবে হাজার হাজার মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। তারা দ্রুত একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের মাধ্যমে চরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের কষ্ট লাঘবে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

বুধবার, ৩ জুন ২০২৬
নড়বড়ে কাঠের সাঁকোই ভরসা, দুর্ভোগে চরাঞ্চলের ২০ হাজার মানুষ
ট্যাগ সমূহ:
জনপ্রিয় সংবাদ

পাবনায় রিয়া হত্যা মামলার ৩ অভিযুক্ত গ্রেপ্তার: গুম করার কাজে ব্যবহৃত প্রাইভেটকার জব্দ

নড়বড়ে কাঠের সাঁকোই ভরসা, দুর্ভোগে চরাঞ্চলের ২০ হাজার মানুষ

প্রকাশিত: ০৬:১০:১৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩ জুন ২০২৬

ভোরের আলো পুরোপুরি ফোটার আগেই তিস্তার শাখা নদীর ওপর নির্মিত নড়বড়ে কাঠের সাঁকোটিতে শুরু হয় মানুষের চলাচল। কেউ মাথায় সবজির ঝুড়ি, কেউ কাঁধে ধান বা ভুট্টার বস্তা, আবার কেউ বই-খাতা ভর্তি স্কুলব্যাগ নিয়ে সাবধানে পার হচ্ছে। বৃদ্ধরা লাঠিতে ভর দিয়ে এগিয়ে যান, আর ছোট শিশুরা ভয়ে মায়ের হাত শক্ত করে ধরে সাঁকো পার হয়। নিচে ঘোলা পানি, ওপরে মেঘলা আকাশ—মাঝখানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিনের পথচলা।

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বেলকা ইউনিয়নের কিশামত সদর ও বেলকা নবাবগঞ্জ গ্রামের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে তিস্তা নদীর একটি শাখা। মাত্র ১২০ ফুট দৈর্ঘ্যের এই নদীই দুই পাড়ের প্রায় ২০ হাজার মানুষের জীবনে দীর্ঘদিন ধরে দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একপাশে বসতি, অন্যপাশে হাট-বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসাকেন্দ্র ও জীবিকার বিভিন্ন ক্ষেত্র।

দীর্ঘ প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে নদী পারাপারের একমাত্র ভরসা ছিল ছোট নৌকা। বর্ষা মৌসুমে নদীর স্রোত বেড়ে গেলে অনেক সময় নৌকা চলাচলও বন্ধ হয়ে যেত। ফলে দুই পাড়ের মানুষ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তেন।

সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়তেন শিক্ষার্থীরা। স্কুল-কলেজে যাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ত। জরুরি রোগীদের হাসপাতালে নিতে বিলম্ব হতো। কৃষকরাও সময়মতো ফসল বাজারজাত করতে না পেরে ক্ষতির মুখে পড়তেন।

এ অবস্থায় ২০১৭ সালে বেলকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ইব্রাহিম খলিলুল্যাহ নিজ উদ্যোগে নদীর ওপর প্রায় ১২০ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি কাঠের সাঁকো নির্মাণ করেন। পরে ইউনিয়ন পরিষদের বরাদ্দ ও তৎকালীন সংসদ সদস্যের সহযোগিতায় সাঁকোটির বিভিন্ন অংশ সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়।

সাঁকো নির্মাণের ফলে চরাঞ্চলের মানুষের যাতায়াত কিছুটা সহজ হয়। কৃষকরা দ্রুত ফসল বাজারে নিতে পারেন, ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড বাড়ে এবং শিক্ষার্থীদের নিয়মিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হয়।

তবে কাঠ ও বাঁশের তৈরি এই অস্থায়ী সাঁকোটি প্রতিবছরই মেরামত করতে হচ্ছে। ২০২০ সালের ভয়াবহ বন্যায় এটি পুরোপুরি ভেঙে গেলে কয়েক মাস চরম দুর্ভোগে পড়েন এলাকাবাসী। পরে নতুন করে সাঁকো নির্মাণ করা হলেও স্থায়ী সমাধান মিলেনি।

সম্প্রতি টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে নদীতে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই সঙ্গে ভেসে আসা বিপুল কচুরিপানা সাঁকোর নিচে জমে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে সাঁকোটির বিভিন্ন অংশ বেঁকে গেছে, কোথাও কাঠ পচে নরম হয়ে পড়েছে, আবার কোথাও বাঁশ আলগা হয়ে দুলছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

স্থানীয়রা জানান, প্রতিদিনই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। কেউ পিছলে পড়ে আহত হচ্ছেন, কেউ সাইকেলসহ নদীতে পড়ে যাচ্ছেন। তারপরও বিকল্প পথ না থাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে।

স্কুলছাত্র মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, “প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে যেতে হয়। বর্ষাকালে সাঁকো আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। একটি স্থায়ী সেতু হলে আমাদের দুর্ভোগ অনেকটাই কমে যাবে।”

কৃষক আমজাদ আলী বলেন, “একটি সেতু হলে কৃষকরা সরাসরি বাজারে যেতে পারত। এতে আমরা ফসলের ন্যায্য দাম পেতাম।”

স্থানীয় ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম বলেন, “মালামাল আনা-নেওয়ায় অতিরিক্ত খরচ হয়। একটি সেতু হলে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসবে।”

পল্লী চিকিৎসক শিহাব মো. শাহাবুদ্দিন বলেন, “জরুরি রোগী হাসপাতালে নিতে অনেক সময় নষ্ট হয়। একটি সেতু হলে স্বাস্থ্যসেবা সহজ হবে।”

ইউপি সদস্য মো. হাফিজার রহমান বলেন, “কাঠের সাঁকো কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। একটি সেতু নির্মাণ হলে শিক্ষা, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্বাস্থ্যসেবায় বড় পরিবর্তন আসবে।”

বেলকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ইব্রাহিম খলিলুল্যাহ বলেন, “প্রতিবছর সাঁকো সংস্কার করা হলেও বন্যা ও কচুরিপানার চাপে এটি আবার নাজুক হয়ে পড়ে। স্থায়ী সমাধানের জন্য সেতু নির্মাণ জরুরি।”

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) তপন কুমার চক্রবর্তী বলেন, “ওই স্থানে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্প অনুমোদন পেলেই বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”

এলাকাবাসীর দাবি, স্বাধীনতার এত বছর পরও একটি সেতুর অভাবে হাজার হাজার মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। তারা দ্রুত একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের মাধ্যমে চরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের কষ্ট লাঘবে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

বুধবার, ৩ জুন ২০২৬
নড়বড়ে কাঠের সাঁকোই ভরসা, দুর্ভোগে চরাঞ্চলের ২০ হাজার মানুষ