বাগেরহাটের ঐতিহাসিক খানজাহান আলী (রহ.) মাজার সংলগ্ন দিঘিতে থাকা একমাত্র নারী কুমিরটিকে অবশেষে অপসারণ করা হয়েছে।
বুধবার (৩ জুন) দুপুরে বন বিভাগের বিশেষজ্ঞ দল স্থানীয়দের সহযোগিতায় দিঘির পূর্ব পাড়ের একটি ছোট জলাশয় থেকে কুমিরটিকে সফলভাবে আটক করে।
উদ্ধারের পর কুমিরটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এর হাত-পা ও চোখ বেঁধে বিশেষ ব্যবস্থায় বন বিভাগের গাড়িতে তোলা হয়। পরে সেটিকে খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে বলে উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে।
সকালের প্রথম থেকেই বন বিভাগ, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মাজার এলাকায় অবস্থান নেন। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কুমিরটির অবস্থান শনাক্ত হওয়ার পর উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। প্রায় দেড় ঘণ্টার চেষ্টার পর দুপুর ১২টার দিকে খাবারের প্রলোভন দেখিয়ে প্রাণীটিকে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়।
উদ্ধার অভিযানকে ঘিরে মাজার এলাকায় উৎসুক মানুষের ব্যাপক ভিড় জমে। কয়েক হাজার দর্শনার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দা কুমিরটিকে একনজর দেখতে সেখানে উপস্থিত হন। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে পুলিশ কাউকে কুমিরটির কাছে যেতে দেয়নি। দূর থেকেই প্রাণীটিকে দেখতে হয় আগ্রহী মানুষদের।
তিন দিন আগে কুমিরটির আক্রমণে এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনার পর মঙ্গলবার (২ জুন) রাতে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত জরুরি সভায় জননিরাপত্তার স্বার্থে কুমিরটি সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
কুমির অপসারণের পর স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। মাজারের প্রধান ঘাটে দীর্ঘদিন পর অনেককে নির্ভয়ে গোসল করতে দেখা গেছে। স্থানীয়দের মতে, কুমিরের ভয়ে এতদিন অনেকেই ঘাট ব্যবহার করতে সাহস পেতেন না।
বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোসা. আতিয়া খাতুন বলেন, “জনসাধারণের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কুমিরটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এটিকে খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে রাখা হবে। ভবিষ্যতে প্রাণীটির বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আলোচনার ভিত্তিতে জানানো হবে।”
উদ্ধার অভিযানের সময় খুলনা বিভাগীয় বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ, সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী, বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আবু রাসেল, ইউএনও মোসা. আতিয়া খাতুন এবং বাগেরহাট মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সামসুল আরেফিনসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, প্রায় সাড়ে ছয়শ বছর আগে খানজাহান আলী (রহ.) এ অঞ্চলের মানুষের পানির চাহিদা পূরণে দিঘিটি খনন করেন। দিঘির নিরাপত্তা ও সংরক্ষণের জন্য সেখানে কুমির অবমুক্ত করা হয়। প্রথম দিকের পুরুষ কুমিরটির নাম ছিল ‘কালা পাহাড়’ এবং স্ত্রী কুমিরটির নাম ছিল ‘ধলা পাহাড়’। পরবর্তীতে তাদের বংশধররাও একই নামে পরিচিতি লাভ করে।
সময়ের পরিক্রমায় প্রজনন সংকট, বিভিন্ন দুর্ঘটনা, মাছ ধরার জালে আটকে আঘাত পাওয়া এবং অন্যান্য কারণে একে একে ঐতিহ্যবাহী কুমিরগুলোর মৃত্যু ঘটে। সর্বশেষ স্থানীয় বংশধর কুমিরটি ২০১৫ সালে মারা যায়। এর আগে ২০০৫ সালে ভারত থেকে কয়েকটি কুমির এনে দিঘিতে ছাড়া হয়েছিল। তবে সেগুলোর বেশ কয়েকটি সময়ের ব্যবধানে মারা যায়। ২০২৩ সালের অক্টোবরে একটি কুমির মারা যাওয়ার পর এই নারী কুমিরটিই একমাত্র জীবিত ছিল।
স্থানীয়দের অনেকেই মনে করছেন, এই কুমিরটি সরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে মাজার দিঘির প্রায় ৬৫০ বছরের কুমির-ঐতিহ্যের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। যদিও প্রশাসনের দাবি, ভবিষ্যতে উপযুক্ত পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে পুনরায় কুমির অবমুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
স্থানীয় খাদেমদের ভাষ্য অনুযায়ী, খানজাহান আলী (রহ.)-এর সময়কার কুমিরগুলোর স্বভাব তুলনামূলক শান্ত ছিল। তবে পরবর্তীতে আনা কুমিরগুলো বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। সর্বশেষ গত সোমবার রাতে ফাতেমা আক্তার নামে এক শিশুকে কুমিরটি টেনে নিয়ে যায়। পরদিন তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এছাড়া ২০২৪ সালে এক বৃদ্ধ, ২০২০ সালে এক কিশোর এবং চলতি বছরের এপ্রিলে একটি কুকুর কুমিরের আক্রমণের শিকার হয়েছিল বলে জানা গেছে।
প্রিন্স মণ্ডল অলিফ, বাগেরহাট প্রতিনিধি 



















