কোরবানির ঈদ এসেছে। সারা দেশে পশু জবাইয়ের আওয়াজ, গোশতের ঘ্রাণ, নতুন পোশাকে শিশুদের ছোটাছুটি—প্রতিটি উঠোনে উৎসবের আমেজ। কিন্তু সুন্দরগঞ্জ উপজেলা হাসপাতালের নিস্তব্ধ ওয়ার্ডগুলোতে সেই উৎসবের হাওয়া পৌঁছায়নি। এখানে ঈদ নেমেছে ভিন্নরূপে—সাদা চাদরে, স্যালাইনের শিশিতে আর চোখের নোনাজলে।
ঈদুল আযহার আগের দিন এই হাসপাতালে গিয়ে কথা হলো কয়েকজনের সঙ্গে। তাঁদের কথা শুনতে শুনতে বুকটা ভারী হয়ে আসে।
স্বামীর হাত ধরে হাসপাতালের করিডোরে বসে আছেন রাশেদা বেগম (৫৫)। চোখ দুটো লাল, বারবার আঁচল দিয়ে মুছছেন। জিজ্ঞেস করতেই কণ্ঠ ভেঙে বললেন—
“একটা ঈদও করতে পারি না। দুঃখের কথা কাকে বলব? কোথায় আছি, একলা থাকি, ঘুম নাই। বাড়িতে থাকলে নাতি-নাতনি নিয়ে কত আনন্দ করতাম। ভেতরের খবর কেউ জানে না—আল্লাহই জানে।”
তাঁর স্বামী মোজাম্মেল হোসেন (৬৫)। সুন্দরগঞ্জের কান্দিরবাজারের পরিচিত মুখ। দীর্ঘ বছর ধরে স্থানীয় মসজিদে ইমামতি করেছেন। পাঁচ বছর আগে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মাথায় গুরুতর আঘাত পান। তারপর থেকে মস্তিষ্কজনিত সমস্যায় ভুগছেন।
দুই ছেলে ও এক মেয়ে—সবাই বিবাহিত, নিজ নিজ সংসারে। বড় ছেলে একটি এনজিওতে কর্মরত, ছোট ছেলে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন।
মোজাম্মেল হোসেন ম্লান হেসে বললেন—
“সারাজীবনে একটি ঈদের জামাতও কখনো মিস করিনি। এবার হলো না। এটাই সবচেয়ে বড় দুঃখ।”
একজন ইমামের কাছে ঈদের জামাতে না দাঁড়াতে পারার যন্ত্রণা—এই ব্যথা শুধু তিনিই বোঝেন।
পাশের বেডে আরেকজন—বেলকা বেপারিপাড়ার বাসিন্দা মমতাজ উদ্দীন (৭০)। জীবনের সত্তরটি বছর পার করেছেন। কিন্তু ঈদুল আযহার ঠিক আগের দিন তাঁর জীবনে নেমে আসে এক নির্মম ঘটনা।
জমিজমার পুরনো বিরোধের জেরে এক ভাই বাড়িতে এসে তাঁকে আঘাত করেন। রক্তাক্ত অবস্থায় ভর্তি হন হাসপাতালে। কোরবানির ঈদটি কাটে হাসপাতালের বেডে, ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে।
ঈদ কেমন গেল—জিজ্ঞেস করতেই বৃদ্ধ মানুষটি কান্নায় ভেঙে পড়লেন। অনেকক্ষণ পর কোনোরকমে বললেন—
“ঈদ আর কি, হাসপাতালের বেডে শুয়ে শুয়ে কি ঈদ হয়, এখানে যে থাকে সেই বোঝে।”
সত্তর বছর বয়সে এসে ভাইয়ের হাতে আহত হওয়া, কোরবানির ঈদের দিনটা হাসপাতালের সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে কাটানো—এর চেয়ে বেদনার চিত্র আর কী হতে পারে।
পাশের বেডে একজন তরুণ ছেলে। বাড়ি গাইবান্ধার মোহনপুর ইউনিয়নে। ঈদের চার দিন আগে বাইক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে সুন্দরগঞ্জ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তার ডান হাতে সমস্যা।
এই কোরবানির ঈদে তার পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন—বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি, আনন্দ, হইহুল্লোড়—সব ঠিকঠাক ছিল। কিন্তু দুর্ঘটনা সব ভেস্তে দিয়েছে। এখন উৎসবের বদলে তার সঙ্গী শুধু যন্ত্রণা আর চার দেয়াল।
সে বলল—
“জীবনে ঈদ সবার জন্য সমান না। যারা হাসপাতালে পড়ে থাকে, অসুস্থ শরীরে থাকে—তারাই বোঝে ঈদ কতটা বেদনার, কতটা যন্ত্রণার।”
বলতে বলতে চোখের কোণে জল জমে উঠল। হাত দিয়ে চুপচাপ মুছে নিল।
কোরবানির পশুর রক্তের ঘ্রাণ মিলিয়ে যাবে, উৎসব শেষ হবে, মানুষ ঘরে ফিরবে। কিন্তু হাসপাতালের এই মানুষগুলো তখনও পড়ে থাকবেন সেই বেডেই।
তাঁরাও চেয়েছিলেন একটু আনন্দ, একটু উৎসব—রাশেদা বেগম চেয়েছিলেন স্বামীকে সুস্থ দেখতে, মোজাম্মেল হোসেন চেয়েছিলেন ঈদের মাঠে তাকবির দিতে, মমতাজ উদ্দীন চেয়েছিলেন পরিবারের সঙ্গে কোরবানির আনন্দে শরিক হতে, আর সেই তরুণ ছেলেটি চেয়েছিল বন্ধুদের সঙ্গে একটু মুক্ত বাতাসে ঘুরতে।
হয়নি। কারো হয়নি।
ওষুধের গন্ধমাখা এই ঘরে যাঁরা পড়ে আছেন, তাঁরাও কারো বাবা, কারো মা, কারো সন্তান, কারো বন্ধু। উৎসবের এই দিনে তাঁদের কথা একটু মনে রাখা দরকার—দরকার একটু খোঁজ নেওয়া, একটু পাশে থাকা।
কারণ ঈদের আনন্দ তখনই পূর্ণ হয়, যখন পাশের মানুষটিও হাসতে পারে।
গাইবান্ধা প্রতিনিধি 























