সক্রিয় আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক। আসে এক রুটে, পাচার হয় পাঁচ রুটে। কাট-আউট পদ্ধতিতে চলছে কারবার।
আন্তঃদেশীয় সোনা কারবারিরা নিয়ন্ত্রণ করছে চট্টগ্রামের সোনা চোরাচালানের আন্ডারওয়ার্ল্ড। সাত আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের ৩০ সিন্ডিকেট মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে কাট-আউট পদ্ধতি অনুসরণ করে চালান নিয়ে আসছে। পরে এসব চালান পাঁচটি রুট ব্যবহার করে প্রতিবেশী দেশ ভারতে পাচার করছে। বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ২৬৩টি সোনার চালান জব্দ করা হয়েছে। তবে কাট-আউট পদ্ধতি অনুসরণ করায় তদন্তকারী সংস্থা পাচারকারীদের নাগাল পাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ সম্পর্কে সিএমপির কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, জব্দ করা সোনা চোরাচালানের ক্ষেত্রে দেখা যায়, কারবারিরা কাট-আউট পদ্ধতি অনুসরণ করে। ফলে এসব মামলার তদন্ত বহনকারী পর্যন্ত গিয়ে থমকে যায়। তারপরও হোতা পর্যন্ত পৌঁছানোর চেষ্টা থাকে এবং এ ক্ষেত্রে তাঁরা সফলও হয়েছেন।
সিআইডি চট্টগ্রাম মেট্রো ও জেলা বিশেষ পুলিশ সুপার মো. সালাউদ্দিন বলেন, সোনা চোরাচালানের নেপথ্যে থাকা হোতারা অনেকটা হোয়াইট কলার ক্রিমিনাল। তাঁরা বিদেশে থেকে কিংবা নিজেদের আড়ালে রেখে সোনা চোরাচালানে অর্থ বিনিয়োগ করেন। নেপথ্যের হোতাদের তথ্য ক্যারিয়ার বা বহনকারীর কাছেও থাকে না। তাই মামলার তদন্তে অনেক হোতা আড়ালে থেকে যান।
এক অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে আন্তঃদেশীয় সোনা চোরাচালান চক্র সক্রিয় রয়েছে। নেপথ্যে রয়েছে সাত আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের ৩০টি সিন্ডিকেট। এ চক্রের সঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশিসহ কয়েকজন ভারতীয় জড়িত। তাঁরা সরাসরি বা হুন্ডি ও মানি এক্সচেঞ্জ কার্যক্রমের মাধ্যমে সোনা চোরাচালান পরিচালনা করেন।
অনুসন্ধান অনুযায়ী, সোনা চোরাচালানের অন্যতম হোতা হিসেবে ফটিকছড়ি উপজেলার দুই চোরাকারবারির নাম উঠে এসেছে। এই দুই সোনা মাফিয়া শ্রমিক ভিসায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতে গেলেও পরে গোল্ড মাফিয়া হয়ে ওঠেন। এ ছাড়া সোনা চোরাচালানের নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে হাকিম, সাত্তার, আলমগীর, মামুন, শাহজাহান, জসিম ওরফে সিএনজি জসিম, আজম ওরফে হুন্ডি আজম, বিধান ও জাহিদসহ ৩০ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে।
জানা গেছে, সোনা গলিয়ে পাত, রড ও পাউডারসহ বিভিন্ন আকার দিয়ে অন্তর্বাস এবং ইলেকট্রনিক সামগ্রীর ভেতরে লুকিয়ে আনা হচ্ছে। রাইস কুকার, ইস্ত্রি, ব্লেন্ডার, ল্যাপটপের ব্যাটারি, খেলনা বা ভয়েস স্পিকারের ম্যাগনেটের ভেতরে রিং আকারেও সোনা আনা হচ্ছে। আবার হুইলচেয়ারের স্টিলের পাইপের ভেতরেও সোনা আনার ঘটনা ধরা পড়েছে।
এসব চালান বহনে ক্যারিয়ার বা বহনকারী হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও ওমান থেকে আসা প্রবাসী শ্রমিকদের। বিদেশি নাগরিকদেরও সোনা পাচারের বাহক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। অভিযোগ পাওয়া গেছে, সোনা চোরাচালানের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকেন কতিপয় ফ্লাইট ক্রু, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং বিমানবন্দরে দায়িত্বরত অন্যান্য সংস্থার সদস্য।
জানা গেছে, সোনার চালান শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে দেশে প্রবেশের পর নগরীর রিয়াজুদ্দিন বাজার, তামাকুমন্ডি লেইন ও হাজারী গলিতে চলে যায়। এখানকার তিন গুদাম থেকে অন্তত পাঁচটি রুট হয়ে সোনার চালান প্রতিবেশী দেশ ভারতে পাচার হয়।
পাচারের আলোচিত রুট ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। এ সড়কে চলাচলকারী বিলাসবহুল বাস, প্রাইভেট কার বা অ্যাম্বুলেন্সের গোপন চেম্বারে করে সোনার চালান ফেনী ও কুমিল্লায় নেওয়া হয়। এরপর কুমিল্লার বিবির বাজার ও ফেনীর সীমান্ত এলাকা দিয়ে চালান ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে পাচার করা হয়।
কিছু চালান পাচারের জন্য রেলপথও ব্যবহার করা হয়। চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন থেকে ট্রেনে করে সোনার চালান ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পৌঁছায়। এরপর আখাউড়া স্থলবন্দর-সংলগ্ন অরক্ষিত সীমান্ত দিয়ে তা ভারতে পাচার করা হয়।
বড় চালানগুলো অনেক সময় সড়ক ও রেলপথে সরাসরি ঢাকা হয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যশোর (বেনাপোল) ও সাতক্ষীরা সীমান্তে চলে যায়। সেখান থেকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার বড় বড় জুয়েলারি মার্কেটে এগুলো প্রবেশ করে।
অভিযোগ অনুযায়ী, সক্রিয় চক্রগুলোর গুটিকয়েক চালান মাঝেমধ্যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো জব্দ করলেও গ্রেপ্তার বা আটক হন ক্যারিয়ার বা বহনকারী। এ ক্ষেত্রে মামলা তদন্ত করতে গিয়ে হোঁচট খায় তদন্তকারী সংস্থাগুলো। মূল হোতার নাগাল তারা পায় না। ফলে ক্যারিয়ারকে একমাত্র আসামি করে বেশির ভাগ মামলায় চার্জশিট দেওয়া হয়।
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস আইসিডির সহকারী কমিশনার আবদুল ছাত্তার বলেন, তাঁরা ক্যারিয়ারকে আটক করে মামলা দায়ের করেন। পরবর্তী প্রক্রিয়া তদন্তকারী সংস্থাই করে। তাই নেপথ্যে কেউ রয়েছেন কি না, তা জানার সুযোগ তাঁদের থাকে না।
চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রকৌশলী ইব্রাহিম খলিল বলেন, সোনা চোরাচালানের মামলা দায়েরের পর থানা পুলিশ তদন্ত করে। এখানে তাঁদের করার কিছু থাকে না।
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন
kalprakash.com/IM