আজ ৭ অক্টোবর শহীদ আবরার ফাহাদ দিবস। দিনটি শহীদ আবরার ফাহাদের সপ্তম শাহাদাতবার্ষিকী। আজ থেকে সাত বছর আগে ২০১৯ সালের ৭ অক্টোবর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে তৎকালীন কিছু চুক্তির সমালোচনা করে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেওয়ায় জীবন দিতে হয়েছে তাঁকে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদকে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সহযোগী (বর্তমানে নিষিদ্ধ) ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছিল।
শহীদ আবরার ফাহাদের সেই আত্মত্যাগ দেশজুড়ে আধিপত্যবাদবিরোধী আন্দোলনের অবিস্মরণীয় প্রতীকে পরিণত হয়েছে। আজ তিনি দেশপ্রেমিকদের কণ্ঠস্বর, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারীদের প্রেরণা।
আধিপত্যবাদবিরোধী লড়াইয়ের শহীদ আবরার ফাহাদের সপ্তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। আজ বুধবার বাদ জোহর ঢাবি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। আবরার ফাহাদের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল মঙ্গলবার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জকসু) উদ্যোগে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের (১৭তম ব্যাচ) ছাত্র আবরার ফাহাদ ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর কুষ্টিয়ার গ্রামের বাড়ি থেকে বুয়েটের হলে ফিরেছিলেন। রাত ৮টায় তাঁকে শেরেবাংলা হলের দোতলার ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে পাঠান তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত বুয়েট (বর্তমানে নিষিদ্ধ) ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুসারে, তাঁর মোবাইল ফোন ঘেঁটে ফেসবুক ও মেসেঞ্জারে ভারতবিরোধী স্ট্যাটাস ও মতাদর্শের প্রমাণ পাওয়ার পর ক্রিকেট স্টাম্প দিয়ে নির্মমভাবে পেটাতে শুরু করেন তাঁরা। পরে চতুর্থ বর্ষের কয়েকজন নেতাকর্মী এসে আরেক দফা নির্যাতন চালান তাঁর ওপর।
রাতভর পৈশাচিক নির্যাতনে একপর্যায়ে নিস্তেজ হয়ে পড়েন আবরার। হত্যাকারীরা তাঁর নিথর দেহ সিঁড়িতে ফেলে রেখে রাতের খাবার খেতে যান। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর আবরারের লাশ সিঁড়ি থেকে হলের ক্যান্টিনে নিয়ে রাখা হয় এবং ভোরে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়। হলের সিসিটিভি ফুটেজে আবরারকে কয়েকজনের ধরাধরি করে সিঁড়ির দিকে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখা যায়।
সে সময় হল প্রাধ্যক্ষ জাফর ইকবাল খান জানান, রাত পৌনে ৩টায় খবর পেয়ে বুয়েটের চিকিৎসক পরীক্ষা করে আবরারকে মৃত ঘোষণা করেন।
আবরার ফাহাদ নিহত হওয়ার ঘটনা নিয়ে সে সময় সারা দেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয় এবং বুয়েটের দীর্ঘদিনের অন্ধকার অধ্যায় জাতির সামনে উন্মোচিত হয়। পরবর্তী সময়ে আবরার হত্যার ঘটনায় (বর্তমানে নিষিদ্ধ) ছাত্রলীগের ২৫ জনকে আটক করা হয়। ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ২০ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। এ মামলায় আরও পাঁচ শিক্ষার্থীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। নিম্ন আদালতের রায় খতিয়ে দেখতে ডেথ রেফারেন্স হিসেবে ২০২২ সালের ৬ জানুয়ারি মামলার নথি হাইকোর্টে পৌঁছায়।
২০২৪ সালের ২৮ নভেম্বর হাইকোর্ট বেঞ্চে এ বিষয়ে শুনানি শুরু হয়। বিচারিক আদালতের দেওয়া ২০ আসামির মৃত্যুদণ্ড ও পাঁচ আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রেখে এক বছর আগে এ মামলায় রায় দেন হাইকোর্ট। এই রায়ের বিরুদ্ধে আসামিরা আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন করলেও রায়ে সন্তুষ্ট রাষ্ট্রপক্ষ কোনো আপিল করেনি।
এখন চূড়ান্ত বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে আবরার ফাহাদ হত্যা মামলা। সাত বছর আগের এ মামলার দুই ধাপের বিচার শেষ হলেও চূড়ান্ত বিচার শেষ হতে কত সময় লাগবে, তা বলতে পারছে না কোনো পক্ষই।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর বুয়েটের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে দীর্ঘদিন ধরে চলা এ ফ্যাসিবাদী পরিবেশ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। শিক্ষার্থীরা মনে করেন, আবরারের হত্যাকাণ্ড ছিল বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা একটি ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার অনিবার্য পরিণতি। আর শহীদ আবরার ফাহাদ হয়ে ওঠেন আধিপত্যবাদবিরোধী এক অবিস্মরণীয় কণ্ঠস্বর।
kalprakash.com/IM