পড়তে বা লিখতে জানেন না। অথচ ছোটবেলা থেকেই রেডিওতে কোরআন তিলাওয়াত শুনতে শুনতে পবিত্র কোরআনের প্রতি তাঁর জন্ম নেয় গভীর ভালোবাসা। সেই ভালোবাসা থেকেই শুরু করেছিলেন কোরআন মুখস্থ করার চেষ্টা। সংসার, সন্তান, স্বামীর অসুস্থতা, জীবনের নানা দায়িত্বে সেই পথ একাধিকবার থেমেছে। কিন্তু স্বপ্ন থামেনি।
শেষ পর্যন্ত ৭১ বছর বয়সে এসে পুরো কোরআন হিফজ সম্পন্ন করেছেন মিশরের সানা আবদেল সাত্তার। পড়তে-লিখতে না জানলেও শুনে শুনে, মনে রেখে এবং অসংখ্যবার পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে কোরআনের ৩০ পারা নিজের অন্তরে ধারণ করেছেন তিনি। তাঁর এই দীর্ঘ যাত্রার গল্প এখন অনেকের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে।
ভারতীয় উর্দু সংবাদমাধ্যম ইউএনএ নিউজের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সানার এই কোরআন হিফজের গল্প।
রেডিওর শব্দ থেকেই কোরআনের সঙ্গে বন্ধন
সানা আবদেল সাত্তার মিশরের মনুফিয়া প্রদেশের শোহাদা এলাকার মিত শাহালা গ্রামের বাসিন্দা। ছোটবেলায় পড়াশোনার সুযোগ না পেলেও কোরআন তিলাওয়াত শোনার প্রতি তাঁর ছিল গভীর আগ্রহ।
রেডিওতে কোরআন তিলাওয়াত শুনতে শুনতেই আয়াতগুলো তাঁর মনে গেঁথে যেতে থাকে। একসময় সেই শোনা থেকেই কোরআন মুখস্থ করার চেষ্টা শুরু করেন তিনি।
বিশের কোঠার শুরুতেই কোরআন হিফজের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় তাঁর। কিন্তু জীবনের বাস্তবতা বারবার তাঁকে থামিয়ে দিয়েছে।
সংসারের দায়িত্বে থেমেছে পথ, থামেনি ইচ্ছা
বিয়ের পর বেড়ে যায় সংসারের দায়িত্ব। তিন সন্তানের লালনপালনের পাশাপাশি পরিবারের নানা দায়িত্বও সামলাতে হয়েছে তাঁকে।
এর মধ্যেই অসুস্থ হয়ে পড়েন তাঁর স্বামী। প্রায় ছয় মাস স্বামীর সেবায় নিজেকে পুরোপুরি নিয়োজিত রাখেন সানা। স্বাভাবিকভাবেই তখন কোরআন হিফজের কাজ থেমে যায়। পরে স্বামীর মৃত্যুর পরও নানা কারণে কিছু সময়ের জন্য বন্ধ থাকে তাঁর হিফজের যাত্রা। কিন্তু কোরআন মুখস্থ করার আকাঙ্ক্ষা কখনো হারিয়ে যায়নি।
আবার কোরআনের কাছে ফিরে আসা
পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে আবার কোরআন হিফজ শুরু করেন সানা। এবার তিনি একা ছিলেন না। এমন মানুষদের খুঁজে নেন, যাঁদের সঙ্গে বসে মুখস্থ করা যায় এবং মুখস্থ করা অংশ পরস্পরকে শুনিয়ে যাচাই করা যায়। এভাবেই ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে থাকে তাঁর দীর্ঘ হিফজের যাত্রা।
বর্তমানে ২০ জনের বেশি নারীর সঙ্গে নিয়মিত কোরআনের মজলিসে অংশ নেন তিনি। বিভিন্ন বয়সের এসব নারী পরস্পরকে কোরআন শুনিয়ে থাকেন এবং মুখস্থ করা অংশ পুনরাবৃত্তি করেন।
মজার বিষয়, সানার এক প্রতিবেশী ও বান্ধবীও পড়তে বা লিখতে জানেন না। তিনিও পুরো কোরআন হিফজ করেছেন।
ফজর থেকে মাগরিব, ১৪ ঘণ্টায় পুরো কোরআন
সানার হিফজজীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনাগুলোর একটি হলো এক বৈঠকে পুরো কোরআন মুখস্থ থেকে তিলাওয়াত করে শোনানো। ফজরের নামাজের পর তিনি তিলাওয়াত শুরু করেন। এরপর বিরতিহীনভাবে তা চালিয়ে যান মাগরিবের সময় পর্যন্ত। প্রায় ১৪ ঘণ্টায় পুরো কোরআন মুখস্থ থেকে শুনিয়েছেন তিনি। মিশরীয় সংবাদমাধ্যম মাসরাওয়ির প্রতিবেদনে এই ঘটনার উল্লেখ রয়েছে।
৭১-এও থামেনি পুনরাবৃত্তি
কোরআন হিফজ শেষ হলেও থেমে নেই সানার পথচলা। বরং এখন তাঁর প্রতিদিনের গুরুত্বপূর্ণ রুটিনের অংশ হয়ে উঠেছে মুখস্থ কোরআনের পুনরাবৃত্তি। মাসরাওয়ির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি প্রতিদিন প্রায় পাঁচ পারা কোরআন পুনরাবৃত্তি করেন।
বয়সের ভারে শরীর হয়তো আগের মতো নেই, কিন্তু কোরআনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। শৈশবে রেডিওতে শুনে যে ভালোবাসার শুরু, সাত দশক পেরিয়েও সেই ভালোবাসাই তাঁকে প্রতিদিন কোরআনের আয়াতের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
সানার গল্প যেন মনে করিয়ে দেয়, শুরু করার জন্য বয়স কখনো শেষ সীমা নয়। পথ যত দীর্ঘই হোক, ইচ্ছা অটুট থাকলে থেমে যাওয়া আর শেষ হয়ে যাওয়া এক কথা নয়।
সূত্র: ইউএনএ নিউজ
kalprakash.com/IM