সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে বিদেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারসহ দুর্নীতির একাধিক অভিযোগ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। নিয়োগ, বদলি ও পদায়ন থেকে শুরু করে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডারে অর্থ লেনদেন এবং কমিশন নেওয়ার অভিযোগও এসেছে তার বিরুদ্ধে। দুদক জানিয়েছে, এসব নতুন অভিযোগ আগে থেকেই চলমান একটি অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত করে খতিয়ে দেখা হবে।
রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে সংস্থাটির সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) তানজির আহমেদ সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। তবে রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
দুদকের সহকারী পরিচালক তানজির আহমেদ জানান, আসিফ মাহমুদ উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগ, জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদায়ন, বিভিন্ন সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার, নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগে ৬৫ কোটি টাকা, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলী নিয়োগে ৫২ কোটি টাকা এবং ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগে ১০ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে। এর মধ্যে চারটি নিয়োগ সংক্রান্ত অভিযোগেই অর্থের পরিমাণ ১৮৭ কোটি টাকা।
এছাড়াও সারাদেশে ৩৬ জন ডিসি পদায়নে ২ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও টেন্ডারে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, সেতু নির্মাণ, ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে। এর মধ্যে শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা এবং আসিফ মাহমুদের নিজ উপজেলা কুমিল্লার মুরাদনগরে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ৪৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন টেন্ডারেও ব্যয় বাড়িয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনকালে অনিয়মের অভিযোগে আগেই আসিফ মাহমুদসহ চারজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। অন্য তিনজন হলেন—মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, সাবেক যুগ্ম সচিব শেখ মোহাম্মদ জোবায়েদ হোসেন এবং উপসচিব মো. মাসুম আহমেদ। দুদকের উপপরিচালক মো. জাহিদ কালামকে প্রধান করে গঠিত চার সদস্যের একটি দল এ অনুসন্ধান চালাচ্ছে।
বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগে বলা হয়েছে, দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। চারটি দেশে কথিত এই পাচারের পরিমাণ মোট ১১ হাজার কোটি টাকা। অভিযোগে পর্তুগালে জমি কেনা, দুবাইয়ের গ্রিন গ্রুপে বিনিয়োগ এবং সুইস ব্যাংকে অর্থ রাখার কথাও উল্লেখ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তার দুই ভগ্নিপতি ও এক ভাগ্নের মাধ্যমে এই অর্থ পাচার করা হয়েছে। এছাড়া আসিফ মাহমুদের বাবা বিল্লাল হোসেন ও এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ঠিকাদার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং পিও মাহফুজুল আলম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও ঘুষ লেনদেনের তদবিরের অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে বিকেলে বাংলামোটরে এনসিপি কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, প্রয়োজনীয় সংস্কার না হওয়ায় দুদক এখনো অতীতের মতোই রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার আগে তরুণদের জন্য এক কোটি কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে চাঁদাবাজির পথ উন্মুক্ত করে নিজেদের দলের ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে। এছাড়া নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন আওয়ামী লীগের প্রকাশ্যে মিছিল সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্য হুমকি উল্লেখ করে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং এ বিষয়ে বিএনপির দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই বলে অভিযোগ করেন।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই ওই উপদেষ্টার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল, তবে তখন অগ্রগতি হয়নি। এখন দুদক সুনির্দিষ্ট অভিযোগের কথা বলছে এবং আসিফ মাহমুদও তা অস্বীকার করে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন, যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কয়েকটি দেশের নাম আসায় বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেয়েছে। দুদক যদি দৃষ্টান্তমূলকভাবে তদন্ত করতে পারে, তবে তাদের ওপর জনগণের আস্থা ফিরবে। তবে ঘুষ দেওয়া ও নেওয়া উভয়ই অপরাধ হওয়ায় ঘুষের মাধ্যমে পদায়ন পাওয়া ৩৬ জন ডিসিকেও বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। অন্যথায় সাধারণ মানুষ একে রাজনৈতিক হাতিয়ার বা নির্বাচনকেন্দ্রিক ষড়যন্ত্র হিসেবে ভাবতে পারে।
kalprakash.com/IM