বাগেরহাটের রামপালে নদীভাঙন এখন আর কোনো মৌসুমি দুর্যোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা স্থায়ী রূপ নিয়ে একের পর এক জনপদকে গ্রাস করছে। বছরের পর বছর ধরে অব্যাহত ভাঙনে নদী এখন মানুষের বসতভিটা, ফসলি জমি, পাকা সড়ক ও সরকারি দপ্তরগুলোর একেবারে কাছাকাছি চলে এসেছে। বিশেষ করে মোংলা-ঘাষিয়াখালী আন্তর্জাতিক নৌ চ্যানেলসংলগ্ন ইউনিয়নগুলোতে এই ভাঙনের ভয়াবহতা সবচেয়ে বেশি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্য অনুযায়ী, নদীভাঙনে বসতভিটা হারিয়ে পেড়িখালী ইউনিয়নের রোমজাইপুরে ৩৫ থেকে ৪০টি পরিবার এবং ওড়াবুনিয়ায় প্রায় ৪০টি পরিবার নিঃস্ব হয়েছে। এ ছাড়া হুড়কা ইউনিয়নের গোলারডাঙ্গি গ্রামে আরও ১৫ থেকে ২০টি পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। বর্তমানে ভাঙনের চরম ঝুঁকিতে দিন কাটাচ্ছে আরও দেড় শতাধিক পরিবার। ভিটেমাটি হারানো অনেকেই সরকারি রাস্তার পাশে কিংবা দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়িতে পলিথিন টানিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
ভাঙনের তীব্রতায় যোগাযোগব্যবস্থাও সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, ইতিমধ্যে এলাকার প্রায় ৬ থেকে ৭ কিলোমিটার পাকা সড়ক নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ২০২০ সালে নির্মিত ৬২০ মিটার দীর্ঘ একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্স কালভার্টের বড় অংশ নদীগর্ভে চলে যাওয়ায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বর্তমানে সরাসরি ভাঙনের মুখে রয়েছে উপজেলা কৃষি অফিস ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ রোগীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে; অনেক স্থানে নৌকাই এখন যাতায়াতের একমাত্র ভরসা।
২০১১-১২ অর্থবছরে মোংলা বন্দর সচল রাখা ও সুন্দরবন রক্ষার স্বার্থে মোংলা-ঘাষিয়াখালী নৌ চ্যানেল খননের কাজ শুরু হয়। পরবর্তীতে চ্যানেলটিতে নাব্য বজায় রাখতে ড্রেজিং কার্যক্রমও অব্যাহত থাকে। তবে স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, প্রকল্পের ডিপিপিতে উল্লেখ থাকা ৮৩টি সংযুক্ত খাল ও নদী পরিকল্পনা অনুযায়ী খনন না করায় পানিপ্রবাহে মারাত্মক ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে।
চ্যানেল রক্ষা সংগ্রাম কমিটির নেতারা অপরিকল্পিত ড্রেজিংয়ের সমালোচনা করে দীর্ঘমেয়াদি নদী ব্যবস্থাপনার দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, নদীর স্বাভাবিক তীব্র স্রোত, জোয়ার-ভাটা, ভারী নৌযানের সৃষ্ট ঢেউ এবং চলমান ড্রেজিং কার্যক্রম—সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবেই এই ভাঙন পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে।
বাগেরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী জয়ন্ত পাল জানিয়েছেন, চ্যানেলের পাঁচ থেকে ছয়টি স্থানে বর্তমানে ভাঙন রয়েছে এবং ইতিমধ্যে তিনটি ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টে প্রতিরক্ষামূলক কাজ শুরু হয়েছে। বড় ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলোতে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের জন্য টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম সম্প্রতি ক্ষতিগ্রস্ত রোমজাইপুর এলাকা পরিদর্শন করে পাইলিং বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন।
তবে স্থানীয় ভুক্তভোগীদের দাবি, শুধু জরুরি কাজের নামে দায়সারা ব্যবস্থা না নিয়ে স্থায়ী ও শক্তিশালী বেড়িবাঁধ নির্মাণ, পরিকল্পিত নদী শাসন এবং নিঃস্ব পরিবারগুলোর কার্যকর পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।
kalprakash.com/IM