নারী থেকে পুরুষে রূপান্তরের অংশ হিসেবে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের কয়েক ঘণ্টা পরই রোজি আক্তার লিজা (৩১) নামের এক তরুণীর মৃত্যু হয়েছে। শনিবার বিকেলে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হওয়ার পর রোববার ভোররাত সাড়ে ৪টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয় বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে।
মৃত লিজা বরিশালের গৌরনদী উপজেলার মাহিলাড়া গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রব হাওলাদারের মেয়ে। তাঁর এই মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। রোববার বিকেলে স্বজনরা ঢাকা থেকে মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসেন এবং সন্ধ্যার মধ্যেই পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়।
পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের ভাষ্য, ছোটবেলা থেকেই লিজার আচরণ ও চলাফেরায় পুরুষালী বৈশিষ্ট্য ছিল। তিনি ছেলেদের মতো চুল কাটতেন এবং কোনো পুরুষকে পছন্দ করতেন না। পারিবারিকভাবে অতীতে দুবার বিয়ে দেওয়া হলেও কোনো সংসারেই তিনি স্থায়ী হননি।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে জেনিফা আক্তার নামে এক তরুণীর সঙ্গে লিজার পরিচয় হয়। এরপর জেনিফা নিয়মিত লিজাদের বাড়িতে যাতায়াত করতেন এবং তাঁরা একসঙ্গে সময় কাটাতেন। এ সময় ঢাকায় চিকিৎসকের অধীনে লিজা হরমোন-সংক্রান্ত চিকিৎসাও নিচ্ছিলেন।
জেনিফা আক্তারের দাবি, লিজার অস্ত্রোপচারের জন্য তাঁর মা-বাবাই দেড় লাখ টাকা দিয়েছিলেন। গত ৩ সেপ্টেম্বর ‘সরফরাজ’ নামে তাঁকে ঢাকার ওই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অস্ত্রোপচারের আগে হাসপাতালের সম্মতিপত্রে লিজার স্ত্রী হিসেবে জেনিফা নিজে স্বাক্ষর করেন বলেও জানান তিনি।
তবে লিজার বাবা মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রব হাওলাদার বলেন, জেনিফা সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করবেন কিংবা তাঁর স্বাক্ষরের ভিত্তিতে অস্ত্রোপচার হবে—এ বিষয়ে পরিবার কিছুই জানত না। এমনকি হাসপাতালে লিজার নাম ‘সরফরাজ’ রাখা হয়েছে, সেটিও তিনি মেয়ের মৃত্যুর দিন জানতে পারেন। তিনি কেবল স্ত্রীর মাধ্যমে শুনেছিলেন যে লিজা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে পুরুষ হয়ে জেনিফাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
লিজার মা জানান, জেনিফা দীর্ঘদিন ধরে লিজার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী হিসেবে তাঁদের বাড়িতে আসা-যাওয়া করতেন। সে কারণে মেয়ের চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের বিষয়টি তাঁরা অনেকটাই জেনিফার ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন।
হাসপাতালের মৃত্যু সনদে দেখা গেছে, সেখানে লিজার নাম ‘সরফরাজ’ এবং লিঙ্গ ‘পুরুষ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সনদ অনুযায়ী, গত ৩ সেপ্টেম্বর তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।
এ বিষয়ে মৃত্যু সনদে থাকা হাসপাতালের নম্বরে যোগাযোগ করা হলে লিমন নামে এক ব্যক্তি নিজেকে অ্যাডমিন কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে জেনারেল ম্যানেজারের (জিএম) সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। পরে হাসপাতালের জিএম বিশ্বজিত বৈদ্যের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ নিয়ে কোনো মন্তব্য না করে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলার অনুরোধ জানান।
অস্ত্রোপচার ও মৃত্যুর কারণ জানতে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ডা. মাহমুদুল হাসানের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্ততার কথা বলে সংযোগ কেটে দেন। পরবর্তীতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি আর সাড়া দেননি। অস্ত্রোপচারের পর এত অল্প সময়ের মধ্যে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী ছিল এবং চিকিৎসায় কোনো অবহেলা বা জটিলতা হয়েছিল কি না—তা হাসপাতাল ও চিকিৎসকের বক্তব্যে স্পষ্ট না হওয়ায় পুরো ঘটনাটি নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।
kalprakash.com/IM