বিশ্ব আজ এক নজিরবিহীন অস্থিরতা ও গভীর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। যুদ্ধ, স্বৈরশাসনের বিস্তার, অর্থনৈতিক মন্দার শঙ্কা, লাগামহীন জলবায়ু পরিবর্তন এবং পারমাণবিক অস্ত্রের আধিপত্য—সব মিলিয়ে মানবজাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে বৈশ্বিক উদ্বেগ ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে বিশ্বশান্তি ও পারস্পরিক সহযোগিতার বাতাবরণ গড়ে উঠেছিল, তা আজ ভেতর থেকেই ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
২০২৩ সালে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল যে সামরিক অভিযান ও ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করেছিল, তা ক্রমে ফিলিস্তিন, লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন, ইরাক, ইরানসহ গোটা উপসাগরীয় অঞ্চলকে মারাত্মকভাবে গ্রাস করেছে। সংঘাতের জেরে গৃহহীন ও বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা আজ ইতিহাসের সব রেকর্ড অতিক্রম করেছে। তবে সবচেয়ে ভীতিজনক দিক হলো—ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে এসব যুদ্ধ এখন একটার সঙ্গে অন্যটা যুক্ত হয়ে এক নিয়ন্ত্রণহীন বৈশ্বিক মহাদাবানলে রূপ নেওয়ার চরম আশঙ্কা তৈরি করেছে। বিশ্বযুদ্ধের পর নির্মিত বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোর প্রধান ভিত্তি ছিল যে জোটব্যবস্থা, তা এখন চরম সংকটে। ইউরোপ ও ন্যাটো যখন অস্তিত্বের দোলাচলে, তখন শুল্কারোপ, সৈন্য প্রত্যাহার ও নানা কটূক্তিতে তাদের কোণঠাসা করছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক তলানিতে এসে ঠেকেছে; অন্যদিকে ওয়াশিংটনের আগ্রাসী মনোভাব ভেনেজুয়েলা আক্রমণ কিংবা গ্রিনল্যান্ড দখলের মতো বিপজ্জনক পরিণতির স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক মেরুকরণ আরও জটিল রূপ ধারণ করেছে। উত্তর কোরিয়াকে মদদ দিচ্ছে চীন; সেই উত্তর কোরিয়া সামরিক রসদ দিচ্ছে রাশিয়াকে; রাশিয়া আবার সহায়তা দিচ্ছে ইরানকে; আর ইরান সেই রসদ পৌঁছে দিচ্ছে হিজবুল্লাহ ও হুতিদের হাতে। এশিয়ার ভূরাজনীতিতে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন ও অস্ট্রেলিয়ার কাছে যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্যতা হ্রাস পাওয়ায় সেখানে চীনের আধিপত্য চোখ রাঙাচ্ছে। অন্যদিকে তাইওয়ানে এখন বেইজিংয়ের আগ্রাসনের আতঙ্ক চরমে, যা ট্রাম্পের সি চিন পিং তোষণনীতির কারণে আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
সংঘাত, জলবায়ু বিপর্যয় আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বিশ্বজুড়ে দেখা দিয়েছে নজিরবিহীন মানবিক বিপর্যয়। এর প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে শুরু হয়েছে লাগামহীন শরণার্থী সংকট, তীব্র খাদ্যঘাটতি আর মহামারির প্রাদুর্ভাব। অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য আন্তর্জাতিক তহবিলে ব্যাপক কাটছাঁট করায় জাতিসংঘের ত্রাণ কার্যক্রম কার্যত ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির তথ্যমতে, পশ্চিম তীরের উর্বর ভূমিতে উগ্র ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের তাণ্ডবে অবরুদ্ধ প্রায় ৯ লাখ ফিলিস্তিনি এখন চরম খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। সোমালিয়ায় তীব্র খরা ও এল নিনোর প্রভাবে কোটি কোটি মানুষ অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন; কলম্বিয়া ও আফগানিস্তানের চিত্রও প্রায় একই রকম। ব্যক্তিগত পর্যায়েও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন ঘটছে। হংকংয়ে মুক্তচিন্তার প্রবক্তা ও প্রবীণ সাংবাদিক জিমি লাইকে দিনে ২৩ ঘণ্টা নির্জন কারাবাসে আটকে রাখা হয়েছে, যা কর্তৃত্ববাদী শাসনের নির্মম বহিঃপ্রকাশ।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও অস্থিরতার ঘনঘটা স্পষ্ট। বিশ্লেষকদের প্রশ্ন—২০০৮ সালের মতো, নাকি তার চেয়েও ভয়াবহ কোনো ধসের সামনে দাঁড়িয়ে বিশ্ব অর্থনীতি? যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণের পরিমাণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের রেকর্ড ছাড়িয়েছে। ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও জাপানসহ প্রধান শক্তিগুলোর কোষাগারও দেনায় নিমজ্জিত। নিয়ন্ত্রণহীন বাণিজ্যঘাটতি, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি আর এআই প্রযুক্তি খাতে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ এক আসন্ন আর্থিক বিপর্যয়ের পূর্বাভাস দিচ্ছে। কেবল এনভিডিয়া, অ্যামাজন, গুগল, মেটা ও মাইক্রোসফটের সম্মিলিত বাজারমূল্যই এখন যুক্তরাষ্ট্রের পুরো শেয়ারবাজারের প্রায় ২৩ শতাংশ। তদুপরি মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার জেরে আগামী শীতে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যার অবধারিত পরিণতি হতে পারে বৈশ্বিক মহামন্দা।
নেপাল ও তিব্বতের সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যার মতো ঘটনাগুলো মনে করিয়ে দিচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের অস্তিত্বজনিত হুমকি কতটা বাস্তব। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, চরম আবহাওয়া এবং পানি ও খাদ্যের সংকট আঞ্চলিক সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানবসৃষ্ট পারমাণবিক অস্ত্রের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার। বিশেষ করে কৌশলগত বা ‘ব্যাটলফিল্ড’ পারমাণবিক অস্ত্রের প্রসার ইউক্রেন বা ইরানের মতো যুদ্ধক্ষেত্রে এদের ব্যবহারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। পারমাণবিক ক্ষমতাসম্পন্ন ৯টি দেশই নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্রভান্ডার আধুনিকায়নে ব্যস্ত, যার অগ্রভাগে রয়েছে চীন। দক্ষিণ কোরিয়া ও সৌদি আরবের মতো দেশগুলোও এখন পরমাণু সক্ষমতা অর্জনের কথা গুরুত্ব দিয়ে ভাবছে। এমনকি এই বিধ্বংসী প্রতিযোগিতা এখন মহাশূন্যেও বিস্তৃত হয়েছে।
আধুনিক সমাজের ভিত্তি উদার ও মানবিক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ আজ চারদিক থেকে আক্রমণের শিকার। ভ্লাদিমির পুতিন ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা অনায়াসে উপেক্ষা করছেন, আর ট্রাম্প ও তাঁর অনুসারীরা এই আদালতকেই কোণঠাসা করতে তৎপর। ইউরোপজুড়ে উগ্র ডানপন্থী ও বর্ণবাদী রাজনীতির বিষবাষ্প দ্রুত ছড়াচ্ছে, যার প্রমাণ মিলেছে জার্মানির স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যের নির্বাচনে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে বিচার বিভাগ ও কংগ্রেসের সহযোগিতায় সাংবিধানিক একনায়কতন্ত্র কায়েমের অপচেষ্টা মার্কিন তথা পশ্চিমা গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যকে এক চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
এত সংকটের মধ্যেও আশার আলো কিন্তু এখনো নিভে যায়নি। প্রথমত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর বিশ্বব্যবস্থার মূল স্তম্ভগুলো চরম আঘাতপ্রাপ্ত হলেও একেবারে ধসে পড়েনি। জাতিসংঘ ও এর সহযোগী সংস্থাগুলো, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা গণতান্ত্রিক জোটগুলো শত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এখনও টিকে রয়েছে। দ্বিতীয়ত, স্বৈরাচার ও যুদ্ধবাজ একনায়কদের শাসনকালও চিরস্থায়ী নয়; ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে তাঁদের পতন অনিবার্য।
সবচেয়ে বড় আশার জায়গা হলো সাধারণ মানুষ ও তরুণ সমাজ। ভারতসহ বিশ্বের উদীয়মান দেশগুলোর তরুণ প্রজন্ম আজ রাজপথে অন্যায়, শোষণ ও স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছে। ভারতে ‘ককরোচ আন্দোলন’-এর মতো নাগরিক জাগরণ প্রমাণ করে যে সাধারণ মানুষ পুরোনো পচা ব্যবস্থার পরিবর্তন চায়। ইতিহাস কোনোদিন একক কোনো রাষ্ট্রপ্রধান বা যুদ্ধবাজ তৈরি করে না; ইতিহাস রচনা করে সাধারণ মানুষ—তাদের সাহস, ত্যাগ, প্রতিবাদ ও পারস্পরিক সহমর্মিতার মধ্য দিয়ে। ভয়ের রাজনীতির বদলে পারস্পরিক সহযোগিতা, বিভাজনের বদলে সংলাপ এবং ক্ষমতার বদলে মানুষের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিলে বিপদের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েও একটি সমৃদ্ধ ও নিরাপদ বিশ্ব বিনির্মাণ সম্ভব।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ানের পররাষ্ট্রবিষয়ক বিশ্লেষক সাইমন টিসডলের নিবন্ধ অবলম্বনে
kalprakash.com/IM