মানবসভ্যতায় মানুষের প্রয়োজনে যুগে যুগে নানা আইন, মতবাদ ও শাসনব্যবস্থা তৈরি হলেও সীমাবদ্ধ জ্ঞান, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ এবং পরিবর্তনের কারণে সেসব ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা বারবার উন্মোচিত হয়েছে। অন্যদিকে মহান আল্লাহর নাজিলকৃত পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান আল-কোরআন মানবজাতির জন্য সর্বকালের সর্বাধুনিক, নিখুঁত ও চিরন্তন দিকনির্দেশনা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
পবিত্র কোরআনে সুরা মায়েদার ৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বিনকে পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য দ্বিন হিসেবে পছন্দ করলাম ইসলামকে।’ এই আয়াতই প্রমাণ করে যে ইসলামের বিধান চূড়ান্ত ও সর্বজনীন। দেড় হাজার বছর আগেই সমাজব্যবস্থা, পরিবার, অর্থনীতি ও মানবাধিকারের যে চিরন্তন মূলনীতি ইসলাম নির্ধারণ করেছে, তা বর্তমান আধুনিক বিশ্বেও পরম প্রাসঙ্গিক।
ইসলামী জীবনদর্শনের অন্যতম বড় শক্তি হলো মানুষের সহজাত প্রকৃতির সঙ্গে এর নিখুঁত ভারসাম্য। সুরা নাহলের ৯০ নম্বর আয়াতে ইনসাফ, সদাচার ও অন্যায় বর্জনের যে সাংবিধানিক মূলনীতি ঘোষণা করা হয়েছে, তা মূলত একটি আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্রের প্রধান ভিত্তি।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও ইসলামের বিধান যুগান্তকারী। সুদভিত্তিক ব্যবস্থার বিষময় ফল ও আর্থিক অস্থিরতার বিপরীতে ইসলাম সুদমুক্ত অর্থব্যবস্থা ও সামাজিক বণ্টনের শিক্ষা দিয়েছে। সুরা বাকারার ২৭৫ নম্বর আয়াতে ব্যবসাকে হালাল ও সুদকে হারাম ঘোষণার যে নীতি দেওয়া হয়েছে, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ‘ইসলামী ব্যাংকিং’-এর দ্রুত প্রবৃদ্ধি ও সফলতা তারই বাস্তব প্রমাণ।
জাতি, বর্ণ, ভাষা ও গোত্রের ভেদাভেদ ভুলে সাম্য ও মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণে তাকওয়ার শর্ত দিয়ে সুরা হুজুরাতের ১৩ নম্বর আয়াতে যে মানবাধিকারের কথা বলা হয়েছে, তা আধুনিক মানবাধিকার সনদের বহু আগেই মানবজাতিকে পথ দেখিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিদায় হজের ভাষণও অনারবি-আরবি বা কৃষ্ণকায়-শ্বেতকায়ের মধ্যকার কৃত্রিম বৈষম্য নিরসনে ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ঘোষণা।
ব্যক্তিগত ইবাদত থেকে শুরু করে রাষ্ট্রনীতি, বিচারব্যবস্থা, যুদ্ধনীতি, নারী অধিকার, উত্তরাধিকার ও পরিবেশ সংরক্ষণের মতো সর্বক্ষেত্রেই কোরআনে সমাধান বিদ্যমান। মানুষের তৈরি আইনের ঘনঘন পরিবর্তন ও বৈশ্বিক নৈতিক সংকট প্রমাণ করে যে মানব রচিত মতবাদ চূড়ান্ত সমাধান দিতে অপারগ। অথচ কোরআনের শাশ্বত নীতি অপরিবর্তনীয় রেখেই ইজতিহাদের সুযোগের কারণে চৌদ্দ শ বছর আগের এই বিধান আজও তেমনি আধুনিক ও বাস্তবমুখী।
অতএব, আধুনিক প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের যুগেও কোরআন ও সুন্নাহর অনুশাসন আঁকড়ে ধরাই দুনিয়া ও আখিরাতে মুক্তির একমাত্র সুনিশ্চিত পথ।
kalprakash.com/IM