২০২৪ সালের ৩ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। সেদিন আন্দোলনকারীরা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংলাপের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে জাতির সামনে একটি মাত্র, আপসহীন দাবি উত্থাপন করেন—প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকারের পদত্যাগ।
শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই বিকেন্দ্রীভূত আন্দোলন ধীরে ধীরে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। সকাল থেকেই হাজারো মানুষ ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জড়ো হতে শুরু করেন। বৃষ্টি উপেক্ষা করে অনেকেই পরিবার-পরিজনকে সঙ্গে নিয়ে জাতীয় পতাকা হাতে এবং নিহত ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের ছবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড বহন করে সমাবেশে যোগ দেন। শহীদ মিনার, দোয়েল চত্বর, জগন্নাথ হল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও শিববাড়ী মোড়জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে জনসমুদ্র। চারদিকে ধ্বনিত হতে থাকে—তুমি কে আমি কে: রাজাকার রাজাকার, দিল্লি না ঢাকা: ঢাকা ঢাকা, দফা এক, দাবি এক: শেখ হাসিনার পদত্যাগ।
বিকেল ৫টায় আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়া সমাবেশে অল্প সময়ের মধ্যেই লাখো মানুষের উপস্থিতি দেখা যায়। শিক্ষক, আইনজীবী, পোশাকশ্রমিক, অভিভাবক, রিকশাচালক ও শিশুসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে অংশ নেন।
সমাবেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকারীরা বলেন, আমরা এক দফা দাবি নিয়ে এখানে এসেছি। আমরা জনগণের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে চাই।
শুধু শহীদ মিনারেই নয়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায়ও আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। মিরপুর-১০ গোলচত্বরে হাজারো শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ অবস্থান নেন। উত্তরায় বিএনএস সেন্টারের সামনে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ান। তাঁদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাইরে? এবং পুলিশ, তুমি কার?
এদিকে ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা সায়েন্স ল্যাব এলাকায় মিরপুর সড়ক অবরোধ করে ঘোষণা দেন যে, এক দফা দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা অবস্থান চালিয়ে যাবেন।
তবে দেশের অন্তত সাতটি জেলায়—গাজীপুর, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, সিলেট, বগুড়া, জামালপুর ও ফরিদপুরে—সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। অভিযোগ ওঠে, পুলিশ ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা (আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ) বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায়। এসব ঘটনায় দুজন নিহত হন এবং অন্তত ৫৫ জন আহত হন।
এর আগে সকালে গণভবনে প্রফেশনালস কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, গণভবনের দরজা খোলা। আমি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসতে চাই, তাদের কথা শুনতে চাই। আমি কোনো সংঘাত চাই না।
তিনি আটক শিক্ষার্থীদের মুক্তির আশ্বাস দেন এবং আন্দোলনে নিহত প্রত্যেকের মৃত্যুর বিচার হবে বলেও ঘোষণা করেন। তবে আন্দোলনের সংগঠক ও অংশগ্রহণকারীরা এই আহ্বান যথেষ্ট বলে মনে করেননি; তাঁদের মতে, অনেক দেরি হয়ে গেছে।
আন্দোলনে নতুন গতি যোগ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘোষিত ১৫ দফা, যার মাধ্যমে অসহযোগ আন্দোলন বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়। এসব নির্দেশনার মধ্যে ছিল কর ও ইউটিলিটি বিল পরিশোধ বন্ধ রাখা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আদালত, কলকারখানা বন্ধ রাখা, সরকারি সেমিনার, অনুষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বর্জন করা। একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) পাঠানো, অফশোর লেনদেন এবং পরিবহন কার্যক্রম স্থগিত রাখার আহ্বান জানানো হয়। তবে হাসপাতাল, জরুরি সেবা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহকে এর বাইরে রাখা হয়। আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রের সঙ্গে সর্বাত্মক অসহযোগিতা গড়ে তোলা, কিন্তু একই সঙ্গে অর্থনৈতিক বিপর্যয় এড়িয়ে জনগণের মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত রাখা এবং শ্রমিকদের বেতন প্রদানের সুযোগ বজায় রাখা।
ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জীবন, সম্পদ এবং গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সব সময় জনগণের পাশে ছিল এবং প্রয়োজনে ভবিষ্যতেও থাকবে।
অন্যদিকে বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক বিবৃতিতে আরও রক্তপাত এড়াতে সরকারের পদত্যাগের দাবি জানান।
kalprakash.com/IM