মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬ | ১৯ শ্রাবণ, ১৪৩৩ | ১৯ সফর, ১৪৪৮ | রাত ৩:১৪:২৩

শুল্ক বৃদ্ধির প্রভাবে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে মাছ আমদানি কমেছে, বন্ধ হওয়ার শঙ্কা

কাল প্রকাশ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬, ৩:৪০
শেয়ার: mail
শুল্ক বৃদ্ধির প্রভাবে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে মাছ আমদানি কমেছে, বন্ধ হওয়ার শঙ্কা

কাল প্রকাশ। ছবি: সংগৃহীত

নতুন অর্থবছরের (২০২৬-২৭) বাজেটে মাছ আমদানির ওপর শুল্ক বাড়ানোর সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়েছে দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোলে। বাজেট কার্যকরের পর থেকেই ভারত থেকে মাছ আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। অতিরিক্ত শুল্কের কারণে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় লোকসানের আশঙ্কায় অনেক আমদানিকারক মাছ আমদানি স্থগিত বা সীমিত করেছেন। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি বন্দরের শ্রমিক, পরিবহন খাত এবং সরকারের রাজস্ব আদায়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

মাছ আমদানিকারকদের দাবি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মাছ আমদানির মোট শুল্কহার ৪৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭০ শতাংশ করা হয়েছে। নতুন বাজেট কার্যকরের পরদিন থেকেই বেনাপোল কাস্টমস নতুন হারে শুল্ক আদায় শুরু করে। এরপর থেকেই বন্দর দিয়ে ভারতীয় মাছের আমদানি দ্রুত কমতে শুরু করেছে। ফলে বাজারে মাছের দাম বাড়ার পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তারা দ্রুত এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন।

বেনাপোল কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, আগে প্রতি কেজি মিঠাপানির মাছ আমদানিতে ৮৬ টাকা ১০ পয়সা শুল্ক দিতে হলেও বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ১৩১ টাকা ৬০ পয়সা। অর্থাৎ প্রতি কেজিতে প্রায় ৪৬ টাকা বেশি শুল্ক দিতে হচ্ছে। এছাড়া সামুদ্রিক মাছ ও রুই মাছের ক্ষেত্রে প্রতি কেজিতে শুল্ক ৪৩ টাকা ১০ পয়সা থেকে বেড়ে ৬৬ টাকা ১০ পয়সা হয়েছে, যা কেজিপ্রতি প্রায় ২৪ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।

বেনাপোল কাস্টমস হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রথমে ৮ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। পরে তা সংশোধন করে ১১ হাজার ২৯০ কোটি টাকা করা হয়। কিন্তু অর্থবছর শেষে আদায় হয়েছে ৬ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা। ফলে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। নতুন অর্থবছরে উচ্চ শুল্কের কারণে আমদানি আরও কমে গেলে রাজস্ব ঘাটতি বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

মাছ আমদানিকারক ব্যবসায়ী রহমত আলী জানান, ভারতীয় মাছের দেশে ব্যাপক চাহিদা থাকলেও অতিরিক্ত শুল্কের কারণে আমদানি ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। এতে লোকসানের ঝুঁকি থাকায় অনেক ব্যবসায়ী মাছ আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য ও রাজস্ব আদায় উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বর্তমান শুল্কহার বহাল থাকলে আমদানি আরও কমে যাবে। ফলে বাজারে মাছের দাম বাড়ার পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আদায়ও কমে যেতে পারে। তাই দ্রুত শুল্কহার পুনর্বিবেচনার দাবি জানান তিনি।

আরেক মাছ ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, নতুন বাজেটে শুল্ক ৭০ শতাংশ হওয়ায় ভারত থেকে মাছ আমদানি করে লাভ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে গেছে। প্রতি চালানে অতিরিক্ত বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ছোট ও মাঝারি আমদানিকারকদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মাছ আমদানি কমে যাওয়ায় বন্দরের শ্রমিকদের কাজও কমে গেছে। শ্রমিকরা জানান, আগে নিয়মিত মাছবোঝাই ট্রাক খালাসের কাজ থাকলেও এখন দিনের পর দিন অপেক্ষা করেও কোনো ট্রাক পাওয়া যাচ্ছে না। এতে তাদের আয়-রোজগার কমে গেছে এবং পরিবার নিয়ে দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে। একই দাবি জানিয়েছেন ট্রাকচালকরাও। তাদের মতে, শুল্ক কমানো হলে আমদানি আবার স্বাভাবিক হবে।

বেনাপোল ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, ট্রাকে থাকা পণ্যের ওজনের পরিবর্তে ট্রাকের চাকার সংখ্যার ভিত্তিতে শুল্ক নির্ধারণের কারণে আগেই মাছ আমদানি কমে গিয়েছিল। নতুন বাজেটে মাছের ওপর আরও শুল্ক বাড়ানোয় ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের সংকটে পড়েছেন। অনেকে আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য ও রাজস্ব আদায় উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শুল্কহার পুনর্বিবেচনা না করলে আমদানি আরও কমে যাবে এবং এর প্রভাব বাজার, ব্যবসা ও সরকারের রাজস্ব আয়ে স্পষ্টভাবে পড়বে।

বেনাপোল ট্রান্সপোর্ট মালিক সমিতির সভাপতি আতিকুজ্জামান সনি বলেন, বেনাপোল দিয়ে ভারত থেকে অনেক পণ্যের আমদানি কমেছে, যার মধ্যে মাছ অন্যতম। আগে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৩৫ ট্রাক মাছ আমদানি হতো। এখন তা কমে ৪ থেকে ৫ ট্রাকে নেমে এসেছে। ফলে অনেক পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।

বেনাপোল স্থলবন্দরের মৎস্য নিয়ন্ত্রণ ও মান নিয়ন্ত্রণ দপ্তরের পরিদর্শক আসাওয়াদুল ইসলাম জানান, বাজেট ঘোষণার আগে প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ ট্রাক বিভিন্ন ধরনের মাছ আমদানি হলেও বাজেট কার্যকরের পর থেকে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। গত অর্থবছরে আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় এক হাজার মেট্রিক টন কম মাছ আমদানি হয়েছে। চলতি অর্থবছরে আমদানি আরও কমতে পারে।

বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার মুক্তা চৌধুরী বলেন, আমদানিকৃত মাছের শুল্ক বৃদ্ধির প্রভাব সম্পর্কে আমদানিকারকরাই ভালো বলতে পারবেন। তবে গত অর্থবছরে বেনাপোল কাস্টমস দিয়ে এক কোটি ২৬ লাখ ৭ টন সুইট ফিশ এবং ৭৪ লাখ ৮১ টন সি ফিশ আমদানি হয়েছে। নতুন বাজেট কার্যকরের পর এ পর্যন্ত ৩৮৬ টন সুইট ফিশ ও ১৯৪ টন সি ফিশ আমদানি হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের দাবি, মাছ আমদানির ওপর বাড়তি শুল্কের কারণে ব্যবসা, কর্মসংস্থান ও রাজস্ব আদায়—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তাই দেশের বাজার ও ব্যবসায়িক স্বার্থ বিবেচনায় সরকার দ্রুত এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবে বলে প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।

kalprakash.com/IM

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সব দেখুন arrow_forward