কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিস্তারের সময়ে সরাসরি প্রযুক্তি কোম্পানিতে বিপুল বিনিয়োগ না করেও এআই খাতের উত্থান থেকে সুবিধা পাচ্ছে ওয়ারেন বাফেটের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে। বিদ্যুৎ, ইউটিলিটি ও শিল্প সরঞ্জাম উৎপাদনের মতো তুলনামূলক প্রচলিত খাতে দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ এখন এআই অবকাঠামোর চাহিদা বৃদ্ধির কারণে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
বিশ্বের অন্যতম খ্যাতিমান বিনিয়োগকারী বাফেটের বিনিয়োগ দর্শনের মূল কথা হলো, যে ব্যবসা তিনি বোঝেন, সেখানেই বিনিয়োগ করা। বিমা, রেলপথ ও বিদ্যুৎ সরবরাহের মতো ঐতিহ্যবাহী খাতকে কেন্দ্র করে ছয় দশকের বেশি সময়ে বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে একটি বিশাল বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
৯৬ বছর বয়সী বাফেট সম্প্রতি বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তবে এআইয়ের উত্থানের মধ্যেও তাঁর দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ কৌশলের প্রভাব প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন ব্যবসায় দেখা যাচ্ছে।
এআইয়ের পেছনে বিদ্যুতের বড় চাহিদা
এআই পরিচালনার জন্য বিপুল কম্পিউটিং সক্ষমতা প্রয়োজন। আর সেই অবকাঠামো চালাতে দরকার প্রচুর বিদ্যুৎ। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রে ডেটা সেন্টারের সংখ্যা ও সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে।
বার্কশায়ারের মালিকানাধীন বিভিন্ন ইউটিলিটি কোম্পানি এই পরিবর্তনের সুবিধা পাচ্ছে। ২০০০ সালে মিডআমেরিকান এনার্জি অধিগ্রহণ করে বার্কশায়ার। প্রতিষ্ঠানটি আইওয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করে।
অধিগ্রহণের সময় এআইয়ের বর্তমান সম্ভাবনার কথা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। কিন্তু দুই দশক পর ডেটা সেন্টারের বিস্তার বিদ্যুতের চাহিদা বাড়িয়ে দেওয়ায় ওই বিনিয়োগের নতুন গুরুত্ব তৈরি হয়েছে।
আইওয়া বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ডেটা সেন্টার কেন্দ্রগুলোর একটি। বার্কশায়ারের প্রধান নির্বাহী গ্রেগ অ্যাবেল গত মে মাসে প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক সম্মেলনে জানিয়েছিলেন, আগের বছর আইওয়ায় বার্কশায়ারের বিদ্যুতের চাহিদার প্রায় ৮ শতাংশ এসেছিল ডেটা সেন্টার থেকে।
নেভাদার ইউটিলিটি কোম্পানি এনভি এনার্জিও বার্কশায়ারের মালিকানাধীন। দ্রুত ডেটা সেন্টার সম্প্রসারণ হওয়া অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে নেভাদাও রয়েছে।
অ্যাপল থেকে অ্যালফাবেট
এআইয়ের সঙ্গে বার্কশায়ারের সম্পর্ক শুধু বিদ্যুৎ খাতেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম বড় বিনিয়োগ অ্যাপল। ২০১৬ সালে বাফেট অ্যাপলে বিনিয়োগ শুরু করেন। তখন অ্যাপলকে মূলত শক্তিশালী ভোক্তা পণ্য ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হিসেবেই দেখা হয়েছিল।
চলতি বছরের জুনে বার্কশায়ার অ্যালফাবেটে বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়। গুগলের সার্চ ব্যবসার পাশাপাশি এআইয়ের সম্ভাবনাও এই বিনিয়োগের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তবে এআইয়ে সরাসরি বিনিয়োগের চেয়ে বার্কশায়ারের পুরোনো অবকাঠামোগত বিনিয়োগগুলোই এখন বড় সুবিধা তৈরি করছে বলে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন।
টারবাইনেও বাফেটের ‘অনিচ্ছাকৃত’ বাজি
২০১৬ সালে বার্কশায়ার ৩ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের বেশি দামে প্রিসিশন কাস্টপার্টস অধিগ্রহণ করে। প্রতিষ্ঠানটি টারবাইনসহ বিভিন্ন শিল্প সরঞ্জামের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ তৈরি করে।
এআই ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ চাহিদা বাড়ায় গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য টারবাইনের চাহিদাও বাড়ছে। ফলে প্রিসিশন কাস্টপার্টসের তৈরি যন্ত্রাংশের গুরুত্বও বেড়েছে।
বার্কশায়ারের এই বিনিয়োগের সময় অবশ্য এআইয়ের বর্তমান বিস্তার অনুমান করা হয়নি। বাফেট নিজেও একপর্যায়ে স্বীকার করেছিলেন, প্রতিষ্ঠানটি কিনতে তিনি বেশি দাম দিয়েছিলেন। কিন্তু এআই অবকাঠামোর দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে সেই ব্যবসা এখন নতুন প্রেক্ষাপটে গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুৎ উৎপাদন, ইউটিলিটি ও শিল্প সরঞ্জামের মতো খাতে বাফেটের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এআই অবকাঠামোর বিস্তারের সঙ্গে পরোক্ষভাবে যুক্ত হয়ে গেছে। অর্থাৎ এআই কোম্পানিতে সরাসরি বড় বাজি না ধরেও এআই অর্থনীতির প্রয়োজনীয় অবকাঠামো থেকে বার্কশায়ার সুবিধা নেওয়ার অবস্থানে রয়েছে।
বাফেটের সম্পদ ও দাতব্য কার্যক্রম
ফোর্বসের তথ্যানুযায়ী, প্রতিবেদনটি প্রকাশের সময় বাফেটের সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৪৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। নিজের সম্পদের ৯৯ শতাংশের বেশি দান করার অঙ্গীকার করেছেন তিনি। এখন পর্যন্ত তাঁর দানের পরিমাণ ৭২ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
২০১০ সালে বিল গেটস ও মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ গেটসের সঙ্গে বাফেট ‘গিভিং প্লেজ’ উদ্যোগ শুরু করেন। বিশ্বের ধনী ব্যক্তিদের নিজেদের সম্পদের উল্লেখযোগ্য অংশ দাতব্য কাজে দেওয়ার অঙ্গীকারে উৎসাহিত করাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
kalprakash.com/IM