ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথিদের সৌদি আরবে হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এর জেরে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনায় পাকিস্তানও জড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা। এমন পরিস্থিতি ইসলামাবাদের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা জটিল করে তুলতে পারে। পাশাপাশি সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির কারণে দেশটিকে কঠিন কূটনৈতিক ও সামরিক সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হতে পারে।
বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক হামলার পর পাকিস্তানের শীর্ষ নেতৃত্ব পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি নিয়ে অন্তর্বর্তী সমঝোতায় সহায়তা করেছিল ইসলামাবাদ। অন্যদিকে গত বছর সৌদি আরবের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করার পর হাজার হাজার পাকিস্তানি সেনা ও যুদ্ধবিমান স্কোয়াড্রন বর্তমানে সৌদি আরবে মোতায়েন রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পাকিস্তানের শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা ইরানকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, সৌদি আরবের ওপর হামলা মানে পাকিস্তানের ওপর হামলা। এটি আমাদের জন্য রেড লাইন। তবে বিষয়টির সংবেদনশীলতার কারণে কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বক্তব্য দিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, হুথিদের হামলা যদি আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে ইয়েমেন সীমান্তের কাছে মোতায়েন পাকিস্তানি সেনাদের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়বে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের স্বার্থ রক্ষায় পাকিস্তানকে প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় সামরিকভাবে হস্তক্ষেপের চাপেও পড়তে হতে পারে।
পাকিস্তানের নিরাপত্তা বিশ্লেষক মুহাম্মদ আমির রানা বলেন, পরিস্থিতি এত দ্রুত জটিল হয়ে উঠবে, তা ইসলামাবাদ আগে ধারণা করতে পারেনি। অপরদিকে অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল গুলাম মোস্তফার মতে, আপাতত পাকিস্তান সব পক্ষকে সংযত রাখার চেষ্টা করছে। তবে হুথিদের হামলা বাড়লে পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন হতে পারে।
রয়টার্স জানায়, ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে পাকিস্তান। দেশটির কর্মকর্তাদের মতে, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের অবস্থানের সঙ্গে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) অবস্থানের পার্থক্য ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।
এদিকে সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে ইরানের একটি প্রতিনিধিদলের ইসলামাবাদ সফরও নির্ধারিত সময়ের তুলনায় পিছিয়ে যায়। পরে ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনির নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদল ইসলামাবাদে পৌঁছে দুই দেশের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক বিষয়, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করে।
এ বিষয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দেশটির সামরিক বাহিনীর গণমাধ্যম শাখা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
তবে বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) নিয়মিত ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দরাবি বলেন, সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানাচ্ছে পাকিস্তান। টেকসই যোগাযোগ, সংলাপ ও কূটনীতির কোনো বিকল্প নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, আঞ্চলিক পরিসরে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে চাইলে পাকিস্তানকে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জটিলতাও মোকাবিলা করতে হবে।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান-সৌদি প্রতিরক্ষা চুক্তি ঘোষণার পর অনেকেই এটিকে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর যুক্তরাষ্ট্রকে নিরাপত্তার একমাত্র ভরসা হিসেবে না দেখে পাকিস্তানসহ অন্য দেশগুলোর দিকে ঝুঁকে পড়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখেছিলেন।
তবে পাকিস্তান তেল ও গ্যাসের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনায় দেশটির জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় জ্বালানির সংকট এড়াতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আগেভাগে বন্ধ রাখাসহ জরুরি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয় শেহবাজ শরিফের সরকার।
বিশ্লেষক ও পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতার লক্ষ্য শুধু কূটনৈতিক প্রভাব বাড়ানো নয়; বরং জ্বালানি সরবরাহের রুট স্বাভাবিক করাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
পাকিস্তানের এক কর্মকর্তা বলেন, হ্যাঁ, হতাশা আছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমরা এই মধ্যস্থতার উদ্যোগ থেকে সরে যাচ্ছি। এতে আমরা অনেক বিনিয়োগ করেছি এবং এটি টিকিয়ে রাখাও আমাদের স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এই সপ্তাহের মতো পরিস্থিতিতে পাকিস্তানকে খুব কম সময়ই এতটা স্পষ্টভাবে কোনো এক পক্ষ বেছে নেওয়ার সম্ভাবনার মুখে পড়তে হয়েছে।
মধ্যস্থতা প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত পাকিস্তানের আরেকটি সূত্র বলেন, যুদ্ধের অবসান সবার জন্যই ভালো। কিন্তু সৌদি আরব যদি আমাদের ডাকে, তাহলে আমরা তাদের পাশেই দাঁড়াব। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
সূত্র: রয়টার্স
kalprakash.com/IM
অনলাইন ডেস্ক 






















