বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা অন্য যেকোনো দুর্যোগের সময় ধৈর্য ধারণের পাশাপাশি মানুষের অন্যতম করণীয় হলো সঠিক তথ্য নিশ্চিত করা, পারস্পরিক সহযোগিতা করা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে মানসিকভাবে স্থির থেকে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে সংকটের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরোনো ছবি, ভিন্ন দেশের ভিডিও কিংবা মনগড়া তথ্য ছড়িয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়। সম্প্রতি চট্টগ্রামের বন্যা নিয়েও এমন কিছু বিভ্রান্তিকর ছবি ও ভিডিও ছড়িয়েছে, যেগুলো বিভিন্ন ফ্যাক্ট-চেক প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী বর্তমান বন্যার নয়। ইসলামের দৃষ্টিতে এ ধরনের মিথ্যা প্রচারণা অনৈতিক ও নিন্দনীয়।
এ ধরনের গুজবে বিভ্রান্ত হয়ে দেশে ও প্রবাসে থাকা মানুষ নানা ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারেন। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় কেউ অসুস্থও হয়ে পড়তে পারেন। পাশাপাশি বাজার পরিস্থিতি, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও জনমনে অযথা আতঙ্কের সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। তাই সংকটময় সময়ে একজন মুমিনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ করণীয় রয়েছে।
যাচাই ছাড়া কোনো তথ্য প্রচার নয়
দুর্যোগের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন আবেগঘন ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। এগুলোর সত্যতা সম্পর্কে শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে বিশ্বাস করা বা শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন,
হে ঈমানদাররা, যদি কোনো ফাসিক তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে নাও। এ আশঙ্কায় যে, তোমরা অজ্ঞতাবশত কোনো জাতির ক্ষতি করে বসবে, পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হবে।
— সুরা হুজুরাত, আয়াত: ৬
এই নির্দেশনা শুধু সংবাদমাধ্যমের জন্য নয়; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী প্রত্যেক মুসলমানের জন্যও প্রযোজ্য। যাচাই-বাছাই ছাড়া সংবাদ প্রচার একজন মানুষকে মিথ্যাবাদী হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে।
রাসুল (সা.) বলেছেন,
কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে তাই বলে বেড়ায়।
— সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭
তাই কোনো আতঙ্কজনক সংবাদ দেখামাত্র তা ছড়িয়ে না দিয়ে প্রথমে নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে যাচাই করা উচিত। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রকৃত তথ্য নিশ্চিত করা যেতে পারে।
এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে আরও বলা হয়েছে,
যখন তাদের কাছে নিরাপত্তা কিংবা ভয়ের কোনো সংবাদ আসে, তখন তারা তা রটিয়ে দেয়। যদি তারা তা রাসুল কিংবা তাদের মধ্যকার কর্তৃত্বশীল ব্যক্তিদের কাছে পেশ করত, তবে অনুসন্ধানকারীরা প্রকৃত বিষয় জানতে পারত।
— সুরা নিসা, আয়াত: ৮৩
আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি ছড়ানো থেকে বিরত থাকা
ইচ্ছাকৃতভাবে জনমনে আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা ইসলামের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন,
যদি মুনাফিক, অন্তরে ব্যাধিগ্রস্ত ব্যক্তি এবং শহরে মিথ্যা সংবাদ প্রচারকারীরা বিরত না হয়, তবে আমি অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে তোমাকে ক্ষমতাবান করে দেব।
— সুরা আহযাব, আয়াত: ৬০
কখনও কেউ মনে করতে পারেন, ত্রাণ সংগ্রহ বা সচেতনতা তৈরির উদ্দেশ্যে অতিরঞ্জিত বা ভুয়া ছবি ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু ইসলামে এ ধরনের পন্থা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ মিথ্যা কখনো কল্যাণ বয়ে আনে না; বরং বিভ্রান্তি ও ক্ষতির কারণ হয়।
রাসুল (সা.) বলেছেন,
তোমরা মিথ্যাচার থেকে বিরত থাকো। কেননা মিথ্যা মানুষকে পাপের দিকে নিয়ে যায়, আর পাপ জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়।
— সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৮৯
মুমিনের করণীয়
সংকটের সময় একজন মুসলমানের দায়িত্ব হলো গুজব ও আতঙ্ক ছড়ানো থেকে বিরত থাকা, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা এবং তথ্য প্রচারের আগে তা নির্ভরযোগ্যভাবে যাচাই করা। সুযোগ থাকলে মানুষকে সঠিক তথ্য দিয়ে সহায়তা করা, ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানো এবং সামর্থ্য না থাকলে অন্তত তাদের জন্য দোয়া করা একজন মুমিনের দায়িত্ব।
kalprakash.com/IM