বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলায় মাহামুদুল হাসান নামের এক ব্যক্তিকে ঘিরে ভুয়া চিকিৎসা কার্যক্রমের গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রশাসনের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও তিনি অবৈধভাবে অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন এবং পুরো কার্যক্রম চালাতে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়া ব্যবহার করছেন।
ঘটনাটিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে সাংবাদিকদের ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগ। তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে পরিকল্পিতভাবে ‘মব’ তৈরি করে সংবাদকর্মীদের ঘিরে ফেলার ঘটনা ঘটেছে—যা শুধু একটি ব্যক্তিগত অনিয়ম নয়, বরং সংগঠিত প্রভাব বিস্তারের ইঙ্গিত দেয়।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই তার চিকিৎসা কার্যক্রম বন্ধ রাখতে নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু সেই নির্দেশ অমান্য করে তিনি আবারও চেম্বার খুলে রোগী দেখা শুরু করেন। নিজেকে ‘ইন্টিগ্রেটেড ফিজিশিয়ান’ পরিচয়ে উপস্থাপন করলেও এ ধরনের পরিচয়ের আইনি ভিত্তি নিয়ে কোনো স্পষ্টতা নেই।
৪ মে বিকেলে সাংবাদিকরা তার বক্তব্য নিতে গেলে তিনি ক্যামেরার সামনে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। পরবর্তীতে ঘটনাস্থল ছাড়ার সময় কয়েকজন ব্যক্তি, যারা নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় দেন, তারা দলবদ্ধভাবে এসে সাংবাদিকদের ঘিরে ধরেন। অভিযোগ রয়েছে—এটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত একটি ভয়ভীতি প্রদর্শনের কৌশল।
প্রশাসনিক নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, জেলার সিভিল সার্জন ডা. আ. স. ম. মো. মাহবুবুল আলম বিষয়টি নিয়ে আগেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছিলেন—‘ইন্টিগ্রেটেড ফিজিশিয়ান’ পরিচয়ে কেউ অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা দিতে পারেন কি না। একই সঙ্গে গাইডলাইন না পাওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
তবে পরবর্তীতে একটি আইনি নোটিশ ঘিরে পরিস্থিতি মোড় নেয়। সিভিল সার্জন নিজেই স্বীকার করেছেন, পুরো বিষয়টি অনুধাবন না করেই তিনি আইনজীবীর পরামর্শে নোটিশের জবাব দেন। প্রশ্ন উঠছে—এই ‘অপরিপক্ব’ জবাব কি অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে?
আরও গুরুতর বিষয় হলো, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর অভিযানে তার ব্যবহৃত ডিগ্রির সত্যতা নিয়ে অসঙ্গতি ধরা পড়ে। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, তিনি যে এমবিবিএস ডিগ্রি ব্যবহার করছেন তা মূলত বিকল্প চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট—যার কোনো স্বীকৃতি বাংলাদেশে নেই।
এমনকি অতীত রেকর্ডও তার বিরুদ্ধে যায়। একটি মামলায় ভুয়া চিকিৎসক হিসেবে তিনি কারাদণ্ড ভোগ করেছেন—তবুও কীভাবে একই কার্যক্রম পুনরায় চালু হলো, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সবকিছু মিলিয়ে একাধিক প্রশ্ন সামনে আসছে:
• প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কীভাবে চিকিৎসা কার্যক্রম চালু থাকে?
• বিতর্কিত ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি?
• সাংবাদিকদের ওপর ‘মব’ তৈরি—এটি কি প্রভাব খাটানোর সংগঠিত কৌশল?
• সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা নাকি ইচ্ছাকৃত নীরবতা কাজ করছে?
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি প্রভাবশালী চক্রের ইঙ্গিত, যেখানে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়ছে এবং আইনের শাসন প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
দ্রুত, স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া এই ঘটনার প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে না—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
প্রিন্স মন্ডল অলিফ, বাগেরহাট প্রতিনিধি 





















