রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলায় ইটভাটার বিষাক্ত ধোঁয়া ও গ্যাসে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আবাদি জমির ফসল ও পরিবেশ। উপজেলার ১১ নম্বর বড়বালা ইউনিয়নের একটি ইটভাটা (TMB) থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া ও ক্ষতিকর গ্যাসের কারণে আশপাশের ফসলি জমিতে দেখা দিয়েছে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, ভাটার নির্গত ধোঁয়া সরাসরি জমির ওপর পড়ায় ধান, ভুট্টা, কলা, মরিচসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফসল ও সবজি ক্ষেত দিন দিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে গাছের পাতা পুড়ে যাচ্ছে, ফলন কমে যাচ্ছে এবং জমির উর্বরতাও হুমকির মুখে পড়ছে।
এছাড়াও পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাতাসে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। শিশু ও বৃদ্ধদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, কাশি ও বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বলে জানান এলাকাবাসী।
ভুক্তভোগী কৃষক আ. রশিদ, সবুজ মিয়া, আবু বক্কর সিদ্দিক, সামছুল হকসহ অনেক কৃষক জানান, ইটভাটার ধোঁয়ার কারণে তাদের উৎপাদিত ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আনুমানিক সব মিলিয়ে প্রায় ৪০ বিঘা জমির ধান, ভুট্টা, পানের বরজ, কলা বাগান, মরিচ, সবজি, পটল, ঝিঙ্গা, ঢেঁড়সসহ বসতবাড়ির আঙিনায় রোপণকৃত মৌসুমি ফলজ গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের দাবি, পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এসব ইটভাটার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে ফসলি জমি ও জনস্বাস্থ্য রক্ষা করতে হবে।
কৃষক আল আমিন জানান, আমার ১২ শতাংশ জমির একটি পানের বরজ আছে, দীর্ঘ ৮ বছর ধরে এই বরজ থেকে পান সংগ্রহ করছি। এবার আমার পানের বরজের অবস্থা খুব খারাপ। বিষাক্ত গ্যাসের কারণে সব পাতা ও আগা ঝলসে গেছে। এই পান ক্ষেত থেকে প্রতি বছর ৮-১০ লাখ টাকার পান বিক্রি করি। ভাটার মালিককে বললেও তিনি কোনো গুরুত্ব দিচ্ছেন না।
কৃষক আতিয়ার রহমান জানান, ইটভাটার বিষাক্ত গ্যাসে আমাদের এলাকার ফসলগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। যে জমিতে আগে ৩ মণ করে ধান হতো, সেখানে এবার ১ মণ ধানও হওয়ার সম্ভাবনা নেই। আমার ৩০ শতাংশ জমির একটি ভুট্টা ক্ষেত আছে, যা পাকতে এখনো ১৫-২০ দিন সময় লাগবে, কিন্তু ভুট্টাগুলো এখন চুপসে যাচ্ছে। ভাটার পশ্চিম পাশে থাকা সব আবাদি জমিরই বেহাল দশা। পাশাপাশি মৌসুমি ফল যেমন আম, কাঁঠাল, আমড়া ইত্যাদির গাছের পাতা পর্যন্ত ঝরে পড়ছে।
ওই ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত কৃষি উপ-সহকারী কর্মকর্তা ইউনুসের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, কৃষকেরা বিষয়টি জানালে তিনি সরেজমিনে গিয়ে ঘটনার সত্যতা পান। তিনি আরও জানান, ধানক্ষেতের গাছের পাতা পুড়ে গেছে এবং গাছগুলো উৎপাদন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে; শুধু দাঁড়িয়ে আছে। এমনকি আগাছাও পুড়ে গেছে। সবজি ক্ষেত ও কলা বাগান থেকেও আশানুরূপ ফলন পাওয়া যাবে না। এটি কোনো সংক্রামক রোগ নয়। আবহাওয়া যদি খরা হতো, তাহলে সব ফসল শুকিয়ে খড়ের মতো হয়ে যেত।
ইটভাটার মালিক তবার মিয়ার সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বললে তিনি জানান, কৃষকেরা বিষয়টি জানিয়েছেন। তিনি মাঠে গিয়েছেন এবং কৃষকদের সঙ্গে বসে সমাধানের চেষ্টা করবেন।
ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তারিকুল ইসলাম স্বপনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, স্থানীয় কৃষকেরা বিষয়টি তাকে অবগত করেছেন। তিনি আরও বলেন, হাটবাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গ্রামের মধ্যবর্তী স্থানে কীভাবে এসব ইটভাটাকে পরিবেশ ছাড়পত্র দেওয়া হয়, তা তদন্ত করা প্রয়োজন।
মিঠাপুকুর প্রতিনিধি 




















