বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় বাবার দায়ের করা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন তাঁর জুনিয়র বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ। নিখোঁজ হওয়ার আগে তাহসিফের সঙ্গে প্রায় ছয় ঘণ্টা সময় কাটিয়েছিলেন তিনি। পরে তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তুরাগ নদসংলগ্ন এলাকা থেকে নম্বরপ্লেটবিহীন একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) দীপকে আদালতে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে নৌ পুলিশ।
নৌ পুলিশের তুরাগ ফাঁড়ির ডিউটি অফিসার উপপরিদর্শক (এসআই) মোস্তাফিজ জানান, উত্তরখান থানায় দায়ের করা হত্যা মামলায় দীপকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁকে আদালতে পাঠানোর প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি চলছে।
এর আগে শনিবার সকালে তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। উত্তরখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাবিব বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় রাজধানীর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হন তাহসিফ। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, জুনিয়র বন্ধু দীপের ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি বাসা থেকে বের হয়েছিলেন।
সেদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের একটি গ্যারেজের সামনে সিসিটিভি ফুটেজে তাহসিফ ও দীপকে একসঙ্গে দেখা যায়। হাত মেলানোর পর তাঁরা আলাদা দুটি মোটরসাইকেলে সেখান থেকে চলে যান।
পরিবারকে দীপ জানিয়েছিলেন, তাহসিফের মোটরসাইকেলে সমস্যা হওয়ায় তাঁরা ওয়ার্কশপে গিয়েছিলেন। মোটরসাইকেল ঠিক করার পর একসঙ্গে খাবার খেয়ে তিনি চলে যান। তবে ওই রাতে তাঁদের চলাফেরা ও যোগাযোগ নিয়ে পরে তদন্ত শুরু হয়।
২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তুরাগ নদে মরদেহ ভাসতে থাকার খবর পেয়ে টঙ্গী নদী পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করেন। হাতঘড়ি ও পকেটে থাকা আইফোনের সূত্র ধরে তাঁর পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
পরদিন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। পরে উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে জানাজা শেষে ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দিবাগত রাতে মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের একটি বাসা থেকে দীপকে হেফাজতে নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
শুক্রবার তাঁকে নিয়ে টঙ্গীর তুরাগ নদসংলগ্ন মাজার বস্তি এলাকায় যায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই এলাকা থেকে নম্বরপ্লেটবিহীন কালো রঙের একটি সুজুকি জিক্সার ১৫০ মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।
পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেন, ঘটনার রাতে তিনি ও তাহসিফ তুরাগ নদসংলগ্ন এলাকায় গিয়েছিলেন। সেখানে কয়েকজন তাঁদের ধাওয়া করলে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন। তবে দীপের এই বক্তব্যের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পিবিআই তাঁর বক্তব্যের বিভিন্ন অসংগতি যাচাই করে এবং ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। পরে দীপকেও নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম ছেলের মৃত্যুর পর থেকেই হত্যার আশঙ্কা প্রকাশ করে আসছিলেন। তাঁর দাবি, ছেলে সাঁতার জানতেন। তাই নদীতে ঝাঁপ দিয়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছে—এমন বক্তব্য নিয়ে সন্দেহ রয়েছে তাঁর।
এখন বাবার দায়ের করা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হলেন দীপ। তাহসিফ কীভাবে তুরাগ নদে পৌঁছালেন, তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী এবং এ ঘটনায় কারা জড়িত, তা তদন্তে বেরিয়ে আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
kalprakash.com/IM