বিখ্যাত গ্রন্থ আ হোমল্যান্ড আউট অব কাভারেজ, হাফ-বেকড হোমল্যান্ড এবং হোয়াটস দ্যাটের লেখক আকরাম আল-সুরানি। তিনি গাজার অন্যতম লেখক ও কবি। গাজায় ‘যুদ্ধবিরতির’ এক বছরে নিজের অভিব্যক্তি জানাতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘আমাদের ব্যক্তিগত জীবন নেই, নেই শান্তি’।
তিনি বলেন, প্রতিদিন সকালে পানি নেওয়ার লাইনে নিজের ও প্রতিবেশীদের দিকে তাকাই, আর হারিয়ে যাওয়া স্বাভাবিক জীবনের স্বপ্ন দেখি। এখন আমরা নিজেদের কাছেও অপরিচিত।
প্রতিদিন সকালে আমি যখন নিজেকে আর প্রতিবেশীদের পানি নেওয়ার লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি, তখন মনে পড়ে, একসময় আমাদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব একটা জীবন ছিল। ছিল ব্যক্তিগত পরিসর, নিজস্ব টুথব্রাশ, নিজের বাড়ি আর নিজের বাথরুম। আমরা কীভাবে মুখ ধুতাম, পরিষ্কার পানি পান করতাম, কখনো কল্পনাও করিনি যে এমন একটা দিন আসবে, যখন এই সাধারণ কাজগুলোই নিজেদের সঙ্গে, পানির প্রতিটি ফোঁটার সঙ্গে একেকটি যুদ্ধে পরিণত হবে। গরম পানির ঝরনার নিচে দাঁড়িয়ে গোসল করাও এখন এমন এক স্বপ্ন, যা পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত রয়েছে।
গাজায় ‘যুদ্ধবিরতি’ ঘোষণার এক বছর পেরিয়ে গেছে। অথচ যুদ্ধ, বোমাবর্ষণ আর মৃত্যুর ছায়া আমাদের জীবন থেকে কখনোই সরে যায়নি।
যুদ্ধ মানে শুধু ভবন ধ্বংস করা কিংবা কোনো আবাসিক এলাকা থেকে মানুষকে সরিয়ে দেওয়া নয়। এই এক বিশাল যুদ্ধের ভেতরেও রয়েছে আরও অনেক ছোট ছোট যুদ্ধ। তাঁবুতে থাকা এক যুদ্ধ। নজরদারি ড্রোন, যার একটানা ভনভন শব্দের কারণে আমরা তাকে ‘জান্নানা’ বলে ডাকি, সেটিও এক যুদ্ধ। পানি নেওয়ার লাইনে দাঁড়ানো এক যুদ্ধ। শৌচাগার ব্যবহারের জন্য অপেক্ষা করা এক যুদ্ধ। ব্যক্তিগত গোপনীয়তার মৃত্যু এক যুদ্ধ। একটি ঘরে গাদাগাদি করে ৩০ জন মানুষের বসবাসও এক যুদ্ধ।
প্রতিদিন সকালে একই প্রশ্ন আমাকে তাড়া করে ফেরে: আজ কী হবে? আমার সন্তানেরা স্কুলের যা কিছু অবশিষ্ট আছে, সেখান থেকে বাড়ির যা কিছু অবশিষ্ট আছে, সেখানে কি ফিরে আসতে পারবে? রাস্তাটির যা কিছু অবশিষ্ট আছে, সেই পথ ধরে হাঁটার সময় যেকোনো মুহূর্তে বোমাবর্ষণ তাদের আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারে।
জ্বালানি সংকট, বারবার সীমান্ত পারাপার বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং গাজায় নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর অতি সামান্য প্রবেশের কারণে যাতায়াত কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। তাই আমার সন্তানদের দীর্ঘ পথ হেঁটে যেতে হয়। মনে হয়, জীবনকেও যেন আমাদের মধ্যে ফোঁটা ফোঁটা করে রেশন হিসেবে বণ্টন করা হচ্ছে।
গাজায় সকালে জীবিত অবস্থায় ঘুম থেকে ওঠাটাই যথেষ্ট নয়। যে জায়গায় রাতে ঘুমিয়েছ, পরের রাতেও সেখানে থাকার সুযোগ থাকবে কি না, তা নিশ্চিত করতে হয়। আশা করতে হয়, তোমার সন্তানেরা যেন এমন একটি সাধারণ দিনের স্বপ্ন দেখতে পারে, যেদিন এক টুকরো রুটি জোগাড় করা, শিক্ষা লাভ করা কিংবা চিকিৎসা পাওয়া এমন কোনো অর্জন হবে না, যা উদ্যাপন করতে হয়।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
kalprakash.com/IM