বাংলাদেশে আত্মপ্রকাশ ঘটেছে নতুন জঙ্গিবাদী দলের। দলটির নাম ‘ইতেহাদুলউম্মাহ’। তাদের সঙ্গে বিদেশি জঙ্গিদলের যোগাযোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা। সম্প্রতি তেজগাঁও কলেজের মসজিদ থেকে আটক ব্যক্তিদের জেরা করে এ তথ্য পাওয়া গেছে। ‘ইতেহাদুলউম্মাহ’ সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “তেজগাঁওয়ে হেফাজতে নেওয়া ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনের ফরেনসিক বিশ্লেষণ ও জিজ্ঞাসাবাদে ‘ইতেহাদুলউম্মাহ’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলার পরিকল্পনার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের বিরুদ্ধে খেলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে উগ্রবাদী তৎপরতায় সংগঠিত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।” সরকার সব ধরনের জঙ্গিবাদী কার্যকলাপ কঠোর হাতে বন্ধ করার বিষয়ে সতর্কতা জারি করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “এ ধরনের উগ্রবাদী তৎপরতার বিষয়ে আমাদের জিরো টলারেন্স রয়েছে।”
প্রসঙ্গত, সম্প্রতি রাজধানীর তেজগাঁও কলেজের একটি মসজিদ থেকে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সন্দেহে ২৩ জনকে আটক করেছে পুলিশ। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে ১৮ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার জুমার নামাজের পর মসজিদে গোপন বৈঠক করার সময় তাঁদের আটক করা হয়। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সাংবাদিকদের এ অভিযানের কথা জানান। তেজগাঁওয়ে জঙ্গি সন্দেহে গ্রেপ্তারের ঘটনায় ফের সামনে এল দেশে জঙ্গিবাদী কার্যকলাপের বিষয়টি। এর আগে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে আল-কায়দাসহ বিভিন্ন জঙ্গিবাদী নেটওয়ার্ক সম্পর্কে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোকে সতর্ক করা হয়েছিল।
পুলিশ সূত্র জানায়, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মসজিদে কথিত বৈঠক চলাকালে তাঁদের আটক করা হয়। অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ) ও কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) কর্মকর্তারা যাচাই-বাছাই ও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাঁদের সিটিটিসির হেফাজতে নেন। জেরায় জঙ্গিবাদী কার্যকলাপের বিভিন্ন তথ্য উঠে আসছে। বলা হচ্ছে, মৌলবাদীদের ছত্রছায়ায় দেশে জঙ্গিবাদীদের তৎপরতা বাড়ছে। একই সঙ্গে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে দেশকে অস্থির করে তোলার গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। পর্দার আড়াল থেকে বিদেশি শক্তি ও ধর্মীয় ভাবাবেগকে কাজে লাগানো হচ্ছে।
তেজগাঁওয়ে গ্রেপ্তারের পরদিন, ১৯ সেপ্টেম্বর, শনিবার মিরপুর ও মধ্য বাড্ডায় তিনটি বাসে আগুন দেওয়া হয়। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে একটি পিকআপেও অগ্নিসংযোগ করা হয়। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। পরদিন রোববারও রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরির চেষ্টা চলছে। নির্বাচনে পরাজিত শক্তিই দেশকে অস্থির করে তুলতে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে মদদ দিচ্ছে বলে গোয়েন্দারা মনে করছেন। তবে পুলিশের কড়া নজরদারির কারণে পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে আছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমল থেকেই দেশে ধর্মীয় মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদী কার্যকলাপ বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের পর জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছিলেন, “দেশে জঙ্গি রয়েছে এবং জঙ্গি তৎপরতা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার বিষয়ে সরকার কাজ করবে।” সরকার সেই লক্ষ্যে কাজ করছে। কিন্তু সরকারকে বিপাকে ফেলতে বিরোধী পক্ষ জঙ্গিবাদীদের মদদ জুগিয়ে চলেছে। দেশকে অস্থির করে তোলার এ খেলায় মানুষের নিরাপত্তা প্রতিনিয়ত বিঘ্নিত হচ্ছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের সময় থেকেই বহু জঙ্গি খোলা আকাশের নিচে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আন্তর্জাতিক তালিকাভুক্ত জেল পালানো তিন কট্টর জঙ্গি নেতাকে এখনো ধরা যায়নি। পলাতক বন্দিদের মধ্যে ৯ জনের বিরুদ্ধে একাধিক জঙ্গিবাদের মামলা ছিল। অনেকের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগও ছিল। ইতিমধ্যে তাঁদের ছয়জনকে ফের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি তিনজনের কোনো খোঁজ নেই বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মোতাহের হোসেন। কারা কর্তৃপক্ষের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকলেও অন্তত ২৭ জন জঙ্গি শুধু নরসিংদী কারাগার ভেঙে পালিয়েছিল বলে জানা যায়। চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে কমপক্ষে ৬৯০ বন্দি পালিয়েছে। তাঁদের অনেকের খোঁজ এখনো মেলেনি। বিভিন্ন সূত্রের খবর অনুযায়ী, জেল পালানো জঙ্গিরা মৌলবাদীদের সঙ্গে মিলে দেশে নতুন নতুন জঙ্গি সংগঠন গড়ে তুলছে। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা চালিয়ে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করাই তাদের লক্ষ্য।
গোয়েন্দারা তেজগাঁও থেকে আটক ব্যক্তিদের জেরা করে জানতে পেরেছেন, ‘ইতেহাদুলউম্মাহ’ নামে নতুন সংগঠন গড়ে খেলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগঠিত হওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে জঙ্গিরা। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা সামনে আসার পর আবারও উগ্রবাদ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, এখনই পরিস্থিতিকে উগ্রবাদের উত্থান হিসেবে দেখার মতো তথ্য নেই। সম্ভাব্য তৎপরতার ওপর নজরদারি চলছে। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে সাধারণ মানুষ অবশ্য এখনই কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের পক্ষে। তাঁদের মতে, দেশকে উগ্রবাদমুক্ত করতে হলে অঙ্কুরেই জঙ্গিবাদকে শেষ করতে হবে।
বাংলাদেশে বহুদিন ধরেই জঙ্গিবাদীদের তৎপরতা চলছে। বিদেশি অর্থ ও সহায়তায় ধর্মের নামে তারা নিজেদের সংগঠন বিস্তার করছে। মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনের মতে, বাংলাদেশে উগ্রবাদ নতুন কোনো বিষয় নয়; দীর্ঘদিন ধরেই এর উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “গত প্রায় দুই বছরে এ ধরনের গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড কতটা কার্যকরভাবে নজরদারিতে ছিল, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এখন তারা নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে, এমন কিছু আলামত আমরা দেখতে পাচ্ছি।”
বিমানবাহিনীর মতো সুশৃঙ্খল বাহিনীর ভেতরেও জঙ্গিবাদীদের জাল বিস্তৃত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। চলতি বছরই চট্টগ্রামের একটি ঘাঁটি থেকে নিখোঁজ হওয়া বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এক ওয়ারেন্ট অফিসারের সন্ধান মিলেছে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) এক ডেরায়। এ ঘটনার পরই সশস্ত্র বাহিনীর অভ্যন্তরে উগ্রপন্থী নেটওয়ার্কের উপস্থিতি নিয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হয়। পাকিস্তান সরকার সম্প্রতি বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছে, তাদের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত টিটিপির পক্ষে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সদস্যও কাজ করছিলেন। প্রতিরক্ষা বাহিনীতে জঙ্গি অনুপ্রবেশ দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। একইভাবে বিপজ্জনক মাদ্রাসার মাধ্যমে শিশুদের মনে জঙ্গিবাদের বীজ বপন। এটি প্রতিহত করতে আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
kalprakash.com/IM