আগামী বছরের শুরুতেই ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে ধাপে ধাপে দেশের ইউনিয়ন পরিষদগুলোর নির্বাচন শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে কমিশন।
জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে প্রথম স্লটের নির্বাচন শুরু হলে রমজান মাসের আগে তিনটি স্লটে দুই হাজার ইউপির নির্বাচন সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) জানিয়েছেন জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার (ইসি) আব্দুর রহমানেল মাছউদ।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে প্রথম স্লটের নির্বাচন হলে তার ৪০ থেকে ৪৫ দিন আগে ইউপি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে।
তিনি বলেন, নভেম্বর-ডিসেম্বরে যেহেতু পাবলিক পরীক্ষা রয়েছে, শিক্ষার্থীরা যেন নির্বিঘ্নে, সুশৃঙ্খল ও সুন্দরভাবে পরীক্ষা দিতে পারে, সে জন্য আগামী বছরের শুরু থেকে, অর্থাৎ জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরু হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। চূড়ান্ত কিছুই হয়নি বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ইউপি নির্বাচনের জন্য সব প্রস্তুতি আছে উল্লেখ করে এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি আছে। আরও যেসব প্রস্তুতি গ্রহণ করা প্রয়োজন, সেটা করব।’ তিনি বলেন, নির্বাচনের প্রস্তুতি একটি চলমান প্রক্রিয়া।
আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, রমজানের আগে একাধিক স্লটে ইউপি নির্বাচন করার চিন্তা করা হচ্ছে। রমজানের পরে আবার শুরু করে জুন মাসের মধ্যে সব ইউপি নির্বাচন শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। রমজানের পরে আবার কখন থেকে ইউপি নির্বাচন শুরু হবে—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রমজানের পরেই এসএসসি পরীক্ষা শুরু হবে। কাজেই তখনকার অবস্থা বিবেচনা করে ঠিক করা হবে।
তফসিল কবে ঘোষণা হতে পারে—এ প্রশ্নের জবাবে ইসি মাছউদ বলেন, নির্বাচনের ৪০ থেকে ৪৫ দিন আগে তফসিল ঘোষণা করা হবে। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে প্রথম স্লটের নির্বাচন হলে তার ৪০ থেকে ৪৫ দিন আগে তফসিল ঘোষণা করতে হবে।
স্থানীয় সরকারের অন্যান্য নির্বাচনের বিষয়ে ইসির পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের পরপরই পৌরসভা নির্বাচন করার চিন্তাভাবনা রয়েছে। ইউপি নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারলে পর্যায়ক্রমে স্থানীয় সরকারের অন্য নির্বাচনগুলো হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন উল্লেখ করে আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ‘আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসন সবারই সহযোগিতা লাগবে। স্কুল-কলেজের শিক্ষকসহ সবার সহযোগিতা লাগবে। কাজেই সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করেই ভালো নির্বাচন করার জন্য আমরা চেষ্টা করব।’
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে উল্লেখ করে ইসি মাছউদ জানান, সম্প্রতি স্থানীয় সরকার নির্বাচন উপলক্ষে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ইসির প্রস্তুতি সভায় তাঁদের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে।
তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলার পরিবেশ স্বাভাবিক ধরেই কাজ শুরু করা হবে এবং সেনাবাহিনীকে প্রথম ডাকা হবে না। তবে প্রথম ধাপে ইউপি নির্বাচন করে যদি মনে হয়, আইনশৃঙ্খলা আরও শক্ত হওয়া দরকার, সে ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হবে। অন্যথায় স্থানীয় সরকারের সব নির্বাচনে সেনাবাহিনীকে ডাকার প্রয়োজন এই মুহূর্তে অনুভব করছেন না বলে জানান তিনি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো ইউপি নির্বাচনও সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন করার শতভাগ প্রচেষ্টা থাকবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যেহেতু আমরা দেশব্যাপী একদিনে একটি বড় নির্বাচন, জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করেছি, সে ক্ষেত্রে ইউপি নির্বাচন এলাকাভিত্তিক বা সংখ্যাভিত্তিক এবং বিভিন্ন স্লটে হবে। আমরা চেষ্টা করব যতদূর সম্ভব গোলমাল, মারামারি, হানাহানি বা অনিয়ম কম হয়।’
এদিকে দেশের মোট ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ২৭২টিতে আইন অনুযায়ী মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ১৮০ দিনের বাধ্যবাধকতার কারণে দ্রুত নির্বাচন আয়োজন করতে হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। সম্প্রতি স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন উপলক্ষে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ইসির সভা শেষে তিনি জানান, ইসি আগামী ৬ জুনের আগেই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সম্পন্ন করতে চায়।
অপরদিকে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানান, আগামী জানুয়ারিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে। তিনি বলেন, সুনির্দিষ্টভাবে আগামী ৬ জুনের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শেষ করার বিষয়ে একটি টাইমলাইন ধরে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। এর মধ্যে সব মামলা-মোকদ্দমা নিষ্পত্তি হয়ে গেলে ইউনিয়ন পরিষদের সংখ্যা আরও বাড়বে। প্রায় ৫ হাজার ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন ধাপে ধাপে করতে গেলেও এক-একটি ধাপে সংখ্যা অনেক বড় হয়ে যাবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আশা রাখি, পরীক্ষাগুলো ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হয়ে গেলে জানুয়ারি থেকে আমরা স্থানীয় সরকার নির্বাচন করতে পারব।’
এদিকে সম্প্রতি ‘ইউনিয়ন পরিষদ (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালা, ২০২৬’-এর গেজেট প্রকাশ করেছে ইসি। সংশোধিত বিধিমালায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থীর জামানত ২৫ হাজার টাকা ও সদস্য প্রার্থীর জামানত ৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি চেয়ারম্যান প্রার্থীর সর্বোচ্চ ব্যয় ১০ লাখ ও সদস্য প্রার্থীর সর্বোচ্চ ব্যয় ২ লাখ টাকা নির্ধারণ করেছে কমিশন।
এ ছাড়া নির্বাচনী দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের হুমকি, ভীতি প্রদর্শন ও বাধা দেওয়ার শাস্তি হিসেবে অনধিক দুই বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের বিধান করা হয়েছে।
অন্যদিকে কোনো প্রার্থী নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের ১৫ শতাংশের কম পেলে তাঁর জামানতের অর্থ বাজেয়াপ্ত হবে। একই সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা সমান হলে কমিশন সর্বোচ্চ সমভোটপ্রাপ্ত প্রার্থীদের মধ্যে পুনরায় ভোট গ্রহণের জন্য রিটার্নিং কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেবে।
kalprakash.com/IM