বাগেরহাটের মোল্লাহাটে খেলতে গিয়ে নিখোঁজ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর মুসলিমা শেখ (৭) নামে এক শিশুর বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় উপজেলার কচুড়িয়া পশ্চিম পাড়ায় একটি বাড়ির উঠানের পানের বরজের পাশ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় শেখ জাহাঙ্গীর (৫৫) ও তার দুই ছেলে রমজান শেখ (২৩) এবং আব্দুর রহমান শেখকে (১৯) আটক করেছে পুলিশ।
নিহত মুসলিমা ওই গ্রামের ইসলাম শেখের (৪০) মেয়ে।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, শনিবার বিকেল আনুমানিক ৪টার দিকে মুসলিমা স্থানীয় একটি শিশুর সঙ্গে খেলতে বের হয়। ওই শিশুটির সঙ্গে তার নিয়মিত চলাফেরা ও খেলাধুলা ছিল। খেলাধুলার একপর্যায়ে মুসলিমাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
এরপর পরিবারের সদস্যরা আশপাশে খোঁজ শুরু করেন। পরিবার সূত্রে জানা যায়, মুসলিমার বাবা-মা জাহাঙ্গীর শেখের বাড়িতেও যান এবং মেয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে তাকে আগেই চলে যেতে দেখা গেছে বলে জানানো হয়।
পরে স্থানীয়দের জানিয়ে বিভিন্ন স্থানে খোঁজ চালানো হয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুটির নিখোঁজ হওয়ার খবর ছড়িয়ে দেওয়া হয়। স্থানীয় সাংবাদিকদের মাধ্যমেও তার সন্ধান চাওয়া হয়।
সন্ধ্যার দিকে জাহাঙ্গীর শেখের বাড়ির উঠানের পানের বরজের উত্তর কোণে ঘেরের বাঁধের পাশে একটি বস্তা দেখতে পান স্থানীয়রা। বস্তাটি কলাগাছের সুতা দিয়ে বাঁধা এবং ওপরে কলাগাছ ও আবর্জনা দিয়ে ঢাকা ছিল। সন্দেহ হওয়ায় বস্তাটি খুললে ভেতরে মুসলিমার মরদেহ পাওয়া যায়।
৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ
নিহত শিশুর বাবা ইসলাম শেখ অভিযোগ করেন, জাহাঙ্গীর শেখ দীর্ঘদিন ধরে তার কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিলেন এবং টাকা না দিলে বড় ধরনের ক্ষতি করার হুমকি দিয়েছিলেন। তার অভিযোগ, চাঁদার টাকা না দেওয়ার জেরেই জাহাঙ্গীর শেখ ও তার সহযোগীরা মেয়েকে হত্যা করে মরদেহ বস্তাবন্দি করে বাড়ির পাশে ফেলে রাখেন। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি; হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হবে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
মরদেহ উদ্ধারের পর উত্তেজনা, অগ্নিসংযোগ
মুসলিমার মরদেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় উত্তেজনা দেখা দেয়। একপর্যায়ে উত্তেজিত জনতার একাংশ জাহাঙ্গীর শেখের বসতঘর, রান্নাঘর, মুরগির ঘর ও পানের বরজে আগুন ধরিয়ে দেয় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। বিএনপির মোল্লাহাট উপজেলা শাখার সভাপতি শেখ হাফিজুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক শিকদার হারুন-অর-রশীদও সেখানে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। ঘটনাস্থলে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে স্থানীয় কয়েকজন অভিযোগ তুললেও তা তাৎক্ষণিকভাবে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
মামলা ও আটক
মোল্লাহাট থানার ওসি শাহাদাত হোসেন জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে এবং ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে শেখ জাহাঙ্গীর ও তার দুই ছেলেকে আটক করা হয়েছে। তিনি জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্ত চলছে।
নিহত শিশুর বাবা ইসলাম শেখ বাদী হয়ে মোল্লাহাট থানায় হত্যা মামলা করেছেন। মামলাটি ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে ২১ নম্বরে রুজু হয়েছে বলে জানা গেছে। পুলিশ মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে ময়নাতদন্তের জন্য বাগেরহাটে পাঠানোর প্রক্রিয়া নিয়েছে।
তদন্তে এখন মূল প্রশ্ন—শিশুটিকে কারা ও কীভাবে হত্যা করেছে, কোথায় তার মৃত্যু হয়েছে, কে মরদেহ বস্তাবন্দি করে সেখানে রেখেছে এবং পরিবারের করা ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগের সত্যতা কতটুকু। এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তেই বেরিয়ে আসবে।
kalprakash.com/IM