কিশোর অপরাধ এখন পরিবার ও সমাজের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিশোরদের একটি অংশ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার খবর প্রায়ই সামনে আসছে। সাম্প্রতিক কুমিল্লার অপ্রতিম হত্যা মামলাতেও কয়েকজন কিশোরের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তদন্তে এসেছে। মামলায় ১৫ ও ১৬ বছর বয়সী দুই কিশোরকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়েও সম্প্রতি বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে শহরটিতে একাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয় থাকার কথা উঠে এসেছে। তবে অপ্রতিম হত্যার সঙ্গে কোনো গ্যাংয়ের সরাসরি সম্পর্ক আছে কি না, সেটি তদন্তাধীন।
কিশোরদের অপরাধপ্রবণতার পেছনে পারিবারিক পরিবেশ, বন্ধুত্ব, আর্থিক সংকট, মাদকাসক্তি, অনলাইন জগতের নেতিবাচক প্রভাব এবং সুস্থ বিনোদনের অভাবসহ নানা কারণ কাজ করতে পারে। ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় পরিবার, সমাজ ও ব্যক্তির দায়িত্বের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
১. পারিবারিক অশান্তি ও অভিভাবকের উদাসীনতা
একটি শিশুর চরিত্র ও মানসিক বিকাশে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পারিবারিক কলহ, অশান্তি, অবহেলা, একাকীত্ব কিংবা বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের দূরত্ব তার স্বাভাবিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ইসলাম পরিবারকে দায়িত্বশীলভাবে পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে মুমিনদের নিজেদের পাশাপাশি পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে (সুরা তাহরিম, আয়াত: ৬)।
তাই সন্তানের শুধু পড়াশোনা বা অর্থনৈতিক চাহিদার দিকে নজর দিলেই হবে না; তার মানসিক অবস্থা, বন্ধুত্ব, দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড ও প্রয়োজনীয় সান্নিধ্যের প্রতিও অভিভাবকদের মনোযোগী হতে হবে।
২. মন্দ সঙ্গ ও বন্ধুত্ব
কৈশোরে বন্ধুদের প্রভাব অনেক বেশি হতে পারে। ভুল বন্ধুত্ব একজন কিশোরকে ধীরে ধীরে এমন পরিবেশে নিয়ে যেতে পারে, যেখানে অন্যায় কাজও স্বাভাবিক বলে মনে হতে শুরু করে।
ইসলাম সৎ মানুষের সাহচর্য গ্রহণের শিক্ষা দিয়েছে। সুরা তাওবার ১১৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহভীরু হয়ে সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সুরা জুখরুফের ৬৭ নম্বর আয়াতে কিয়ামতের দিন মুত্তাকিরা ছাড়া ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা একে অপরের শত্রু হয়ে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
তাই সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় সময় কাটাচ্ছে এবং তার বন্ধুমহলের আচরণ কেমন—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন থাকা প্রয়োজন।
৩. অবাধ স্বাধীনতা ও আধিপত্যের মানসিকতা
কৈশোরে সন্তান নিজেকে স্বাধীন ও সক্ষম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এই স্বাভাবিক প্রবণতা সঠিকভাবে পরিচালিত না হলে কখনো তা অবাধ্যতা, অহংকার বা আধিপত্যের মানসিকতায় রূপ নিতে পারে।
সুরা লোকমানে অহংকার, মানুষকে অবজ্ঞা করা এবং উদ্ধত আচরণ থেকে বিরত থাকার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সংযত আচরণ ও নম্রভাবে কথা বলার নির্দেশও রয়েছে।
অভিভাবকদের তাই কেবল কঠোর শাসন নয়, বরং ভালোবাসা, যুক্তি, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা এবং দায়িত্বশীল স্বাধীনতার মাধ্যমে সন্তানকে পরিচালিত করতে হবে।
৪. আর্থিক সংকট ও সামাজিক বৈষম্য
অর্থনৈতিক দুর্বলতাও কিছু কিশোরকে অপরাধী চক্রের প্রলোভনের কাছে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে। অর্থের প্রয়োজনকে কাজে লাগিয়ে অপরাধী চক্র কিশোরদের নানা অনৈতিক কাজে ব্যবহার করার চেষ্টা করতে পারে।
ইসলাম এতিম, অসহায় ও দরিদ্র মানুষের আর্থিক অধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। সুরা নিসার ২ নম্বর আয়াতে এতিমদের সম্পদ সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সুরা বাকারার ২১৫ নম্বর আয়াতে পিতা-মাতা, আত্মীয়স্বজন, এতিম ও অভাবগ্রস্তদের জন্য সম্পদ ব্যয়ের কথা বলা হয়েছে।
সমাজের অসহায় শিশু-কিশোরদের শিক্ষা, নিরাপত্তা ও মৌলিক প্রয়োজন নিশ্চিত করতে পরিবার ও সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে।
৫. নেশার নেতিবাচক প্রভাব
নেশা মানুষের বিচারবোধ ও আত্মনিয়ন্ত্রণ দুর্বল করতে পারে এবং বিভিন্ন অপরাধের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ইসলামে নেশাজাতীয় দ্রব্য কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। হাদিসে সব ধরনের নেশা সৃষ্টিকারী দ্রব্যকে মদের অন্তর্ভুক্ত এবং হারাম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাই কিশোরদের ক্ষেত্রে শুরু থেকেই নেশার ক্ষতি সম্পর্কে বয়সোপযোগী শিক্ষা, পারিবারিক নজরদারি এবং প্রয়োজন হলে যথাযথ সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
৬. ডিজিটাল জগতের নেতিবাচক প্রভাব
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম কিশোরদের জ্ঞান ও সৃজনশীলতার সুযোগ তৈরি করলেও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নানা ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। সহিংস বা অপরাধমূলক কনটেন্ট, অনলাইন উসকানি এবং অপরাধকে আকর্ষণীয় হিসেবে উপস্থাপনকারী কনটেন্ট কিশোরদের চিন্তাভাবনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে সমাধান হিসেবে কিশোরদের পুরোপুরি প্রযুক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন করার বদলে ডিজিটাল সচেতনতা, পারিবারিক যোগাযোগ এবং দায়িত্বশীল ব্যবহারের শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন।
ইসলামে মানুষের কথা, কাজ, দৃষ্টি ও শ্রবণের জবাবদিহির কথা বলা হয়েছে। সুরা বনি ইসরাইলের ৩৬ নম্বর আয়াতে জ্ঞান না থাকা বিষয়ে অনুসরণ না করার এবং কান, চোখ ও হৃদয়ের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
৭. সুস্থ বিনোদনের অভাব
খেলাধুলা, সৃজনশীল কর্মকাণ্ড ও পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগের অভাবও কিশোরদের একাকীত্ব বাড়াতে পারে। বিশেষ করে শহুরে জীবনে অনেক শিশু-কিশোর দীর্ঘ সময় ডিভাইসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
ইসলামী ঐতিহ্যে শিশুদের বয়সোপযোগী খেলাধুলা ও বিনোদনের সুযোগ দেওয়ার উদাহরণ রয়েছে। সহিহ বুখারির একটি হাদিসে আয়েশা (রা.)-এর পুতুল নিয়ে খেলার বর্ণনা পাওয়া যায়।
তাই শিশু-কিশোরদের জন্য খেলাধুলা, বই পড়া, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে স্বাস্থ্যকর সামাজিক যোগাযোগ এবং সৃজনশীল কাজের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
অপরাধ ঠেকাতে প্রয়োজন পরিবার-সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ
কিশোর অপরাধের সমাধান শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সম্ভব নয়। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অপরাধের ঝুঁকিতে থাকা শিশু-কিশোরদের আগেই শনাক্ত করে তাদের পাশে দাঁড়ানো জরুরি।
অভিভাবকদের সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। স্কুল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শিক্ষার্থীদের আচরণগত ও মানসিক পরিবর্তনের বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। একই সঙ্গে সমাজকে খেলাধুলা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়াতে হবে এবং অপরাধী চক্র যেন কিশোরদের ব্যবহার করতে না পারে, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, একটি কিশোরকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার আগেই তাকে সঠিক পথে ফেরানোর সুযোগ তৈরি করতে হবে। পরিবারে ভালোবাসা, নৈতিক শিক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ, দায়িত্বশীল স্বাধীনতা এবং সুস্থ সামাজিক পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে অনেক কিশোরকে অপরাধের পথ থেকে দূরে রাখা সম্ভব।
আল্লাহ আমাদের শিশু-কিশোরদের সব ধরনের অন্যায় ও অপরাধ থেকে হেফাজত করুন এবং তাদের সৎ, চরিত্রবান ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার তাওফিক দিন। আমিন।