পাবনার ফরিদপুর উপজেলার বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্র নাফিউল করিম সোহান (২৩) হত্যা মামলায় লাশ উত্তোলনের আট মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো ফরেনসিক প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করেছে নিহতের পরিবার। এতে হতাশ হয়ে পড়েছেন নাফিউলের বাবা-মা।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে পাবনা শহরের একটি সংবাদপত্র কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে বিভিন্ন অভিযোগের কথা জানান নাফিউলের বাবা-মা।
তারা বলেন, সন্তান হত্যার প্রায় ১৫ মাস এবং লাশ উত্তোলনের আট মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো ফরেনসিক প্রতিবেদন দেওয়া হচ্ছে না। মামলার কোনো আসামিও গ্রেপ্তার হয়নি। অভিযুক্তরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং তাদের হুমকি-ধামকি দিচ্ছেন বলেও দাবি করেন তারা।
মামলা সূত্রে জানা যায়, পাবনার ফরিদপুর উপজেলার দিঘুলিয়া গ্রামের রেজাউল করিম ও নাসিমা আক্তার দম্পতির সন্তান নাফিউল করিম সোহান (২৩)। তিনি গণবিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন।
গত বছরের ৫ জুন নাফিউল ঈদের ছুটিতে বাড়িতে আসেন। ৯ জুন সকালে ঘুম থেকে উঠে তার বাবা-মা ছেলের মরদেহ দেখতে পান।
নিহতের বাবা-মায়ের অভিযোগ, বাড়ির সামনে জমি কেনার পর থেকেই নাফিউলের চাচা ইব্রাহিম হোসেন, নজরুল ইসলাম ও চাচাতো ভাইদের সঙ্গে বিরোধ দেখা দেয়। এর জেরে গত ২৪ এপ্রিল ওই জমির মাটি কাটা নিয়ে তাদের মধ্যে ঝগড়া হয়। এ সময় নাফিউলকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তারা।
নাফিউলের বাবা-মায়ের অভিযোগ, ৮ জুন রাতে কোনো এক সময় তার চাচা ও চাচাতো ভাইয়েরা মিলে শ্বাসরোধ করে তাকে হত্যা করেন।
ছেলেকে হারানোর পর নানা চাপ ও সংকটের মধ্য দিয়ে ৪ আগস্ট নাফিউলের মা নাসিমা আক্তার বাদী হয়ে ছয়জনকে আসামি করে পাবনার আদালতে একটি হত্যা মামলা করেন। তদন্তের স্বার্থে আদালতের নির্দেশে চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি নিহত নাফিউলের লাশ কবর থেকে উত্তোলন করে পুলিশ।
মামলা করার পর থেকেই আসামিপক্ষ বিভিন্নভাবে তাদের হুমকি-ধামকি ও হয়রানি করছে বলে অভিযোগ করেছেন নাফিউলের বাবা-মা। এমনকি তাদের মারধর করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা। এতে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে জানান নিহতের স্বজনরা।
নিহত নাফিউলের বাবা রেজাউল করিম বলেন, ‘আমাকে বিভিন্ন সময়ে হুমকি-ধামকি দেওয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে, তোর ছেলেকে মেরেছি, তোকে শেষ করে দেব। আমরা কি আমাদের সন্তান হত্যার বিচার পাব না? নাকি সন্তান হত্যার বিচার চেয়েই ভুল করেছি? সরকারের কাছে আমার দাবি, আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিলে সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। প্রকৃত হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
নাফিউলের মা নাসিমা আক্তার বলেন, ‘আসামিদের সঙ্গে পুলিশের সব সময় যোগাযোগ থাকত। কারণ, আসামিরা থানায় যাতায়াত করত। সেটা দেখে আমি ভয়ে থানায় কখনো যাওয়ার সাহস পেতাম না—না জানি কখন কে আমার ওপর হামলা করে। যেহেতু তারা হুমকি দিয়ে আসছে, এই অবস্থায় দিন কাটছে। আমি সন্তান হত্যার ন্যায়বিচার চাই। ফরেনসিক প্রতিবেদনটি যেন দ্রুত দেওয়া হয় এবং আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়। সেই সঙ্গে দ্রুত চার্জশিট দেওয়ার মাধ্যমে অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।’
এ বিষয়ে ফরিদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মঞ্জুরুল আলম মাসুদ বলেন, ‘ফরেনসিক প্রতিবেদন চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। আর হুমকি-ধামকির বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) গ্রহণ করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আমি নতুন এসেছি। মামলার বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে, কী অবস্থায় আছে।’
এদিকে মামলার প্রধান অভিযুক্ত ইব্রাহিম হোসেন নিহতের পরিবারের অভিযোগকে মিথ্যা দাবি করে বলেন, ‘ছেলেটা কীভাবে মারা গেছে, আমরা নিজেরাও জানি না। পুলিশ তো তদন্ত করেছে। তারা আদালতে মামলা করেছে। আইনে যেটা হয়, হবে। কোনটা সত্য, কোনটা মিথ্যা—আদালত প্রমাণ করবে।’