ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠীর হামলা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নতুন করে বিমান হামলার সহায়তা চেয়েছে সৌদি আরব। তবে হুতিদের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযান পরিচালনার বিষয়ে এখন পর্যন্ত সম্মতি দেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এতে ওয়াশিংটন ও রিয়াদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি ও ফিনান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনা, ট্যাংকারসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হুতিদের হামলা বেড়েছে। সৌদি ভূখণ্ড লক্ষ্য করেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর অভিযোগ রয়েছে গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে।
একই সময়ে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের কিছু এলাকায় হুতিদের নিয়ন্ত্রণ আরও বিস্তৃত হয়েছে। এর ফলে বৈশ্বিক নৌবাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছাকাছি তাদের অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
ফিনান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, হুতিদের বিরুদ্ধে বারবার বিমান হামলা চালানোর জন্য ওয়াশিংটনের কাছে অনুরোধ করেছিল রিয়াদ, তবে যুক্তরাষ্ট্র সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে। এর পরিবর্তে সৌদি আরবকে অস্ত্র ও গোয়েন্দা সহায়তা দেওয়ার পথ বেছে নিয়েছে ওয়াশিংটন। গত সপ্তাহে সৌদি আরবের কাছে সম্ভাব্য ২৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির অনুমোদনও দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন, যদিও এসব যুদ্ধবিমান সরবরাহে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচির পরিচালক মোনা ইয়াকুবিয়ান মনে করেন, সৌদি আরবকে এই মুহূর্তে সরাসরি সামরিক সহায়তা না দেওয়ার মার্কিন সিদ্ধান্ত দুই দেশের সম্পর্কে আরও উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। তিনি ফিনান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, এতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সৌদি আরব ভবিষ্যতে কী ধরনের সহযোগিতা আশা করতে পারে, তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ না নেওয়ার মার্কিন সিদ্ধান্ত সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্কেও চাপ তৈরি করতে পারে বলে কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন।
সাবেক মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের গোয়েন্দা পরিচালক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল কারেন গিবসনের মতে, ওয়াশিংটনের বর্তমান অবস্থান থেকে সৌদি আরবের কাছে এমন বার্তা যেতে পারে যে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ হুমকির মুখে পড়লেও যুক্তরাষ্ট্র সব সময় সরাসরি সামরিকভাবে পাশে নাও দাঁড়াতে পারে।
তবে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থানের পেছনে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পদের ওপর চাপ, ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত এবং জ্বালানির বাজারে অস্থিরতার মতো একাধিক বিষয় কাজ করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কয়েকটি মার্কিন সংবাদমাধ্যমও দাবি করেছে, কয়েক মাসের সামরিক অভিযানের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুতে চাপ তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্প ও মোহাম্মদ বিন সালমানের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও বিভিন্ন সময়ে ওয়াশিংটন ও রিয়াদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা গেছে। চলতি বছরের মে মাসে সৌদি আরব ওয়াশিংটনকে জানিয়েছিল, সামরিক অভিযানের জন্য মার্কিন যুদ্ধবিমানকে দেশটির ঘাঁটি বা আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হবে না। এরপর মধ্যপ্রাচ্যে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে সহায়তার জন্য নেওয়া একটি মার্কিন সামরিক পরিকল্পনা স্থগিত করেন ট্রাম্প। সৌদি আরবের আশঙ্কা ছিল, ওই পরিকল্পনার ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোতে আরও হামলার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এর মধ্যে হুতিদের সাম্প্রতিক তৎপরতা সৌদি আরবকে এমন এক সংঘাতের দিকে ফের টেনে আনছে, যেখান থেকে বেরিয়ে আসতে রিয়াদ দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করে আসছে। গত জুলাইয়ে গোষ্ঠীটি সৌদি বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ ঘোষণা করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে ওমানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও হুতিদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। হুতি কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, তারা সৌদি জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করার কথা বললেও যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো দেশের আন্তর্জাতিক জাহাজে হামলা না করার অবস্থান জানিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও জানিয়েছেন, হুতিরা মার্কিন স্বার্থে হামলা না করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে।
ফলে একদিকে সৌদি আরব হুতিদের হামলা মোকাবিলায় আরও সরাসরি মার্কিন সামরিক সহায়তা চাইছে, অন্যদিকে ওয়াশিংটন আপাতত সরাসরি বিমান হামলায় না গিয়ে অস্ত্র, গোয়েন্দা সহায়তা ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ওপর জোর দিচ্ছে। এই অবস্থানই দুই মিত্র দেশের সম্পর্কের সামনে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।
kalprakash.com/IM