দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে স্কেলের গেজেট প্রকাশ হয়েছে। নতুন কাঠামোয় মূল বেতন বাড়ানো, উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার অপেক্ষার সময় কমানোসহ বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু নতুন বেতন কাঠামো সামনে আসতেই হিসাবের অন্য একটি দিক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গ্রেড বাড়লে যেখানে আর্থিক সুবিধা বাড়ার কথা, সেখানে কিছু ক্ষেত্রে মূল বেতন বাড়লেও কমে যাচ্ছে বাড়িভাড়া ভাতা।
বিশেষ করে ১৬তম গ্রেড থেকে ১৫তম গ্রেডে উন্নীত হওয়ার ক্ষেত্রে এই অসামঞ্জস্য স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ফলে নতুন পে স্কেল কর্মচারীদের প্রত্যাশা পূরণের পাশাপাশি বেতন-ভাতার কাঠামোর কিছু জায়গায় নতুন বিতর্কও তৈরি করেছে।
গ্রেড ওপরে, বাড়িভাড়া নিচে
নতুন কাঠামো অনুযায়ী, দেশের অন্যান্য এলাকায় ১৬ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা মূল বেতনের ৪৫ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া পাবেন। বিপরীতে ১০ থেকে ১৫তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য এই হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ শতাংশ। ফলে ১৬তম গ্রেড থেকে ১৫তম গ্রেডে উন্নীত হলে মূল বেতন বাড়লেও বাড়িভাড়া পাওয়ার হার কমে যাচ্ছে।
দুটি গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন বিবেচনা করলে হিসাবটি আরও পরিষ্কার হয়। নতুন পে স্কেলে ১৬তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২১ হাজার ৯০০ টাকা। এর ৪৫ শতাংশ হিসাবে বাড়িভাড়া দাঁড়ায় ৯ হাজার ৮৫৫ টাকা। অন্যদিকে ১৫তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২২ হাজার ৮০০ টাকা। কিন্তু ৩৫ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া হিসাব করলে পাওয়া যায় ৭ হাজার ৯৮০ টাকা। অর্থাৎ ১৫তম গ্রেডে মূল বেতন ৯০০ টাকা বাড়লেও বাড়িভাড়া কমে যাচ্ছে ১ হাজার ৮৭৫ টাকা।
এক ধাপ উন্নতিতে হিসাবের উল্টো স্রোত
তবে শুধু বাড়িভাড়া দিয়ে দুই গ্রেডের মোট আর্থিক সুবিধার চূড়ান্ত হিসাব করা যাবে না। একজন সরকারি কর্মচারীর মোট প্রাপ্য নির্ধারণে চিকিৎসা, শিক্ষা, উৎসব, মোবাইলসহ বিভিন্ন প্রযোজ্য ভাতাও যুক্ত হয়। তাই গ্রেড পরিবর্তনের পর প্রকৃত আর্থিক লাভ বা ক্ষতি নির্ধারণ করতে পুরো বেতন-ভাতা কাঠামো একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। তবু গ্রেড বাড়ার সঙ্গে বাড়িভাড়ার হার কমে যাওয়ার বিষয়টি কর্মচারীদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
নববর্ষের উৎসবে এবার কাটছাঁটের ছায়া
নতুন কাঠামোয় বাংলা নববর্ষ ভাতার হারও কমানো হয়েছে। বিদ্যমান ২০ শতাংশের পরিবর্তে ভবিষ্যতে মূল বেতনের ১৫ শতাংশ হারে এ ভাতা দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
তবে পরিবর্তনটি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হচ্ছে না। গেজেট অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিদ্যমান হারেই উৎসব ও বাংলা নববর্ষ ভাতা দেওয়া হবে। নতুন ১৫ শতাংশ হার কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।
সন্তানের পড়াশোনায় ৫০০ টাকার হিসাব
শিক্ষা সহায়ক ভাতাতেও নতুন কাঠামো এসেছে। প্রতি সন্তানের জন্য মাসে ৫০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ দুই সন্তানের জন্য মোট ১ হাজার টাকা শিক্ষা সহায়ক ভাতা দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। তবে বর্তমান সময়ে শিক্ষা ব্যয়ের বাস্তবতার সঙ্গে এই অঙ্ক কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের একটি অংশ প্রশ্ন তুলেছে।
পদোন্নতি নয়, তবু আট বছরেই গ্রেড বদলের সুযোগ
উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে আগে ১০ বছর অপেক্ষার পর উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ ছিল। নতুন কাঠামোয় সেই অপেক্ষার সময় কমিয়ে আট বছর করা হয়েছে। অর্থাৎ পদোন্নতি না হলেও নির্ধারিত শর্ত পূরণ হলে আট বছর পর উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ থাকবে। তবে এই উচ্চতর গ্রেডকে পদোন্নতি হিসেবে গণ্য করা হবে না।
২০ ধাপের কাঠামোয় শুরু ২০ হাজারে
নতুন পে স্কেলে মোট ২০টি গ্রেড রাখা হয়েছে। ২০তম গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা। ১৬তম গ্রেডে তা ২১ হাজার ৯০০ টাকা এবং ১৫তম গ্রেডে ২২ হাজার ৮০০ টাকা। অন্যদিকে সর্বোচ্চ প্রথম গ্রেডে মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
তবে গেজেট প্রকাশ হলেও নতুন বেতনের পুরো সুবিধা একসঙ্গে কার্যকর হচ্ছে না। কাঠামোটি ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হলেও ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়ন করা হবে।
২০২৬ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১০ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা নতুন মূল বেতনের বাড়তি অংশের ৫০ শতাংশ পাবেন। নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে এ হার ৪০ শতাংশ। পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে পুরো বেতন কার্যকর হবে।
সাভার আছে, কিন্তু পুরো উপজেলা কোথায়?
বাড়িভাড়া নির্ধারণে এলাকার শ্রেণিবিন্যাস নিয়েও আপত্তি উঠেছে। কর্মচারীদের দাবি, পে কমিশন ও সচিব কমিটির সুপারিশে সাভার উপজেলাকে ব্যয়বহুল এলাকা হিসেবে বিবেচনার বিষয়টি অনুমোদিত হলেও চূড়ান্ত গেজেটে সাভার উপজেলার পরিবর্তে শুধু সাভার পৌরসভা উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে সাভার পৌরসভার বাইরে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কর্মরত সরকারি কর্মচারীরা প্রত্যাশিত বাড়িভাড়া সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নতুন স্কেলে পুরোনো বৈষম্যের ছায়া
নতুন পে স্কেলের বিভিন্ন দিক নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদের ব্যানারে দেশের অন্তত ১৩টি সংগঠনের নেতারা এসব অসঙ্গতি নিয়ে করণীয় নির্ধারণে বৈঠক ডেকেছেন।
পরিষদের সদস্যসচিব মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, দীর্ঘ অপেক্ষার পর নতুন পে স্কেল এলেও এতে বৈষম্য রয়ে গেছে। তাঁর ভাষায়, আগের কাঠামোয় থাকা বৈষম্যের কিছু অংশ নতুন বেতন কাঠামোতেও থেকে গেছে, যা কর্মচারীদের জন্য মেনে নেওয়া কঠিন।
গেজেটের পর এখন সংশোধনের অপেক্ষা
কর্মচারী সংগঠনগুলোর মূল দাবি, নতুন পে স্কেলে গ্রেডভিত্তিক বেতন ও ভাতার মধ্যে আরও সামঞ্জস্য আনা এবং বৈষম্য কমানো। তাদের আপত্তির কেন্দ্রে রয়েছে বাড়িভাড়া ভাতার হার, শিক্ষা সহায়ক ভাতা, বাংলা নববর্ষ ভাতা এবং ব্যয়বহুল এলাকার শ্রেণিবিন্যাস। এসব বিষয় পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে তারা।
কর্মচারীদের প্রত্যাশা, নতুন পে স্কেল পুরোপুরি বাস্তবায়নের আগে যেসব জায়গায় বেতন-ভাতার মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে, সেগুলো সংশোধন করে কাঠামোটিকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করা হবে।
kalprakash.com/IM