সেবা সহজীকরণ, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার, গণশুনানি ও অভিযোগ নিষ্পত্তির মাধ্যমে সরকারি সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে দক্ষ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক জনবান্ধব প্রশাসন গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছে বর্তমান সরকার।
তবে প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল নীতিগত ঘোষণা কিংবা ওপরের নির্দেশনায় মাঠ প্রশাসনের চিত্র বদলাবে না। এর জন্য প্রয়োজন সঠিক কর্মকর্তা বাছাই, তাঁদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া এবং একই সঙ্গে কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
বিশেষ করে জেলা প্রশাসক (ডিসি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), সিভিল সার্জন, বিভাগীয় কমিশনারসহ মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে সততা, দক্ষতা ও কাজের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন তাঁরা। কারণ সরকারের কোনো নীতি বা সিদ্ধান্তের শেষ পরীক্ষা হয় মাঠ পর্যায়ে।
সচিবালয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হলেও একজন সাধারণ মানুষ সেই সিদ্ধান্তের সুফল পান জেলা, উপজেলা কিংবা স্থানীয় সরকারি দপ্তরে। তাঁদের মতে, কয়েকটি দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া গেলে মাঠ পর্যায়ে দ্রুতই বার্তা পৌঁছানো সম্ভব।
সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সচিব এবং মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা, ডিসি, ইউএনও, সিভিল সার্জন যাঁরা সরাসরি প্রশাসন পরিচালনা করেন, তাঁদের সততা, দক্ষতা ও সদিচ্ছাই আসল। ফলে শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ না দিয়ে সঠিক লোক বাছাই করা, তাঁদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়ার সুযোগ দেওয়া এবং ব্যর্থতার ক্ষেত্রে কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘অপরাধ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে কোনো উদ্যোগ সফল করা সম্ভব নয়।’
সচিবসভায় সমন্বয় ও গতি বাড়ানোর তাগিদ
গত মঙ্গলবার সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে উচ্চপর্যায়ের সচিবসভা অনুষ্ঠিত হয়। মন্ত্রিপরিষদসচিব ড. নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে ওই সভায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ৬২ জন সচিব অংশ নেন। সভায় সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের সুফল জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে প্রশাসনে আরও গতি আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি দূর করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পাশাপাশি দ্রুত বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
সভায় অংশ নেওয়া কয়েকজন কর্মকর্তা প্রশাসনের অন্যতম সমস্যা হিসেবে সমন্বয়হীনতার বিষয়টি তুলে ধরেন। তাঁদের মতে, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পথে মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে যথাযথ সমন্বয় না থাকলে কাজের গতি কমে যায়। সরকারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ সিদ্ধান্ত নেওয়ার পাশাপাশি দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
মাঠ পর্যায়েই দৃশ্যমান হয় সরকার
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি প্রশাসন সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা তৈরি হয় মূলত মাঠ পর্যায়ের সেবা পাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে। একজন নাগরিক সচিবালয়ের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া দেখেন না; তিনি দেখেন ভূমি অফিস, উপজেলা প্রশাসন, সরকারি হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, সমাজসেবা অফিস কিংবা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কী ধরনের সেবা পাচ্ছেন।
কোনো নাগরিক নামজারি করতে গিয়ে দিনের পর দিন ঘুরছেন কি না, হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসক পাচ্ছেন কি না, সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র খোলা আছে কি না, কিংবা অভিযোগ জানিয়ে দ্রুত প্রতিকার পাচ্ছেন কি না—এসব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই প্রশাসনের জনবান্ধব হওয়ার বাস্তব চিত্র তৈরি হয়। এ কারণে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তা বাছাইয়ের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্য খাতে তদারকি
স্বাস্থ্য খাতের মাঠ পর্যায়ের চিত্র এ সমস্যার বড় উদাহরণ। দেশের বিভিন্ন এলাকায় কমিউনিটি ক্লিনিক, উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র কিংবা সাব-সেন্টার রয়েছে। কিন্তু অবকাঠামো থাকলেও কোথাও চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতি অনিয়মিত, কোথাও আবার দীর্ঘদিন সেবা কার্যক্রম অচল থাকার অভিযোগ রয়েছে।
গাজীপুরের শ্রীপুরে একটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে গেটে তালা দেখতে পান গাজীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. রফিকুল ইসলাম বাচ্চু।
সদিচ্ছা না থাকলে উদ্যোগ ব্যর্থ
দোহার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাঈদুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী মাঠ প্রশাসনে তাঁরা জনবান্ধব বা ‘প্রো-পিপল’ হয়ে কাজ করার চেষ্টা করছেন, যাতে সাধারণ মানুষ দ্রুত ও স্বল্প সময়ে কাঙ্ক্ষিত সেবা পায়। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয় যথাসম্ভব কমিয়ে আনার নীতিও অনুসরণ করছেন।’
মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতে, সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত সদিচ্ছার বড় ভূমিকা রয়েছে। একজন কর্মকর্তা যদি নিয়মিত তদারকি করেন এবং অধীন প্রতিষ্ঠানের সমস্যা দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেন, তাহলে একই কাঠামোর মধ্যেও সেবার মান বদলে যেতে পারে।
টার্গেট দিয়ে ব্যর্থ হলে ব্যবস্থা
প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, মাঠ কর্মকর্তাদের দায়িত্বের সঙ্গে নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা টার্গেট যুক্ত করা প্রয়োজন। একজন ডিসি, ইউএনও, সিভিল সার্জন কিংবা অধিদপ্তরের মাঠ কর্মকর্তাকে শুধু দায়িত্ব দিলেই হবে না; কী কাজ করবেন, কত সময়ে করবেন এবং কাজের ফলাফল কী হবে—এসব স্পষ্ট করতে হবে।
এরপর নির্দিষ্ট সময় পরপর কাজের অগ্রগতি মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। সফল হলে স্বীকৃতি এবং ইচ্ছাকৃত অবহেলা, অনিয়ম বা দুর্নীতি পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নিতে হবে।
সচিবই মন্ত্রণালয়ের মূল চালিকাশক্তি
মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রমে সচিবের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, মন্ত্রী নীতিগত দিকনির্দেশনা ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেন। আর মন্ত্রণালয়ের দৈনন্দিন প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার মূল দায়িত্ব সচিবের।
একটি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত কত দ্রুত বাস্তবায়িত হবে, অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় কেমন হবে এবং মাঠ পর্যায়ে নির্দেশনা কতটা কার্যকরভাবে পৌঁছাবে—এসব ক্ষেত্রে সচিবের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কাজ নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে। সচিবালয় থেকে শুধু নির্দেশনা পাঠালেই হবে না, সেই নির্দেশনা মাঠ পর্যায়ে কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, তারও হিসাব নিতে হবে।’
হঠাৎ পরিদর্শনে বাড়তে পারে দায়িত্বশীলতা
মাঠ প্রশাসনের কার্যক্রমে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নজরদারিকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন প্রশাসনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ভিডিও কনফারেন্সে মাঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা, নির্দিষ্ট লক্ষ্য দেওয়া এবং হঠাৎ সরকারি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করলে কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীলতা বাড়তে পারে।
রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নিয়োগের প্রশ্ন
জনবান্ধব প্রশাসন বাস্তবায়নে বড় প্রশ্ন হলো গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মকর্তাদের বাছাই কীভাবে হবে। প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক পরিচয় বা ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের পরিবর্তে কর্মকর্তার সততা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, নেতৃত্বের সক্ষমতা ও কাজের রেকর্ডকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
দায়িত্ব পাওয়ার পর তাঁদের অযাচিত হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত রেখে কাজের সুযোগ দিতে হবে। কাজের স্বাধীনতার পাশাপাশি সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা এবং অনিয়ম হলে ব্যবস্থা—দুটিই নিশ্চিত করতে হবে।
ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবায়নের সেতুবন্ধ
জনবান্ধব প্রশাসনের লক্ষ্য বাস্তবায়নে শেষ পর্যন্ত তিনটি বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন প্রশাসনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা—সঠিক কর্মকর্তা নির্বাচন, কাজের স্বাধীনতা ও কঠোর জবাবদিহি। এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন, ডিজিটাল মনিটরিং, গণশুনানি, অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা।
সচিবালয়ে সচিব, বিভাগে বিভাগীয় কর্মকর্তা, জেলায় ডিসি, উপজেলায় ইউএনও এবং সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের মাঠ কর্মকর্তারা এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেন। ফলে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত দায়িত্ব ও জবাবদিহির একই কাঠামো নিশ্চিত করা না গেলে জনবান্ধব প্রশাসনের ঘোষণা বাস্তবে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনবে না।
kalprakash.com/IM