বহুল প্রতীক্ষিত সরকারি চাকরিজীবীদের নবম জাতীয় বেতন কাঠামো বা পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর এখন খসড়া প্রজ্ঞাপন ও সংশ্লিষ্ট এসআরও প্রস্তুত, আইনগত যাচাই এবং পরবর্তী আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার কাজ চলছে।
মন্ত্রিসভা গত ৩১ আগস্ট জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুমোদন করে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে। তবে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পরই সরাসরি গেজেট প্রকাশ করা যায় না। এর আগে খসড়া প্রজ্ঞাপন চূড়ান্ত করা, আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং এবং বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয় (বিজি প্রেস) থেকে প্রকাশের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পে-স্কেলের গেজেট প্রক্রিয়ায় সময় লাগার অন্যতম কারণ হলো এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নথির পরিমাণ। একটি মূল প্রজ্ঞাপনের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি ও প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পৃথক এসআরও প্রস্তুত করা হচ্ছে। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি একাধিক ধাপে সম্পন্ন করতে হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, পে-স্কেলের কাগজপত্র অনেক বেশি। একটি মূল গেজেটের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক এসআরও প্রস্তুত করা হচ্ছে। এ কারণে এক পৃষ্ঠার কোনো নথির মতো দ্রুত ভেটিং করিয়ে ফেলার সুযোগ নেই। তবে দ্রুত কাজ শেষ করার চেষ্টা চলছে।
তিনি আরও বলেন, পে-স্কেল বাস্তবায়নে কোনো জটিলতা নেই। এমনভাবে কাজ করা হচ্ছে, যাতে পরে বাস্তবায়নের সময় কোনো ত্রুটি বা জটিলতা তৈরি না হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আইনি যাচাই শেষে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে গেজেট প্রকাশের জন্য তা বিজি প্রেসে পাঠানো হবে। এরপর নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন পুনর্নির্ধারণ ও ফিক্সেশনের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া যাবে।
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে বিভিন্ন শ্রেণি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক এসআরও জারির প্রস্তুতিও চলছে। এসব এসআরওতে সংশ্লিষ্টদের বেতন নির্ধারণ, ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা বাস্তবায়নের বিস্তারিত বিধান থাকতে পারে।
পৃথক এসআরও
নতুন পে-স্কেলের মূল কাঠামোর পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ভাতা ও আর্থিক সুবিধা কীভাবে কার্যকর হবে, তা পৃথক এসআরওতে নির্ধারণ করা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য পৃথক এসআরওগুলোর আওতায় থাকবে—বেসামরিক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, বাংলাদেশ পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, সশস্ত্র বাহিনী, বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিশেষ শ্রেণি বা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োগবিধি।
এসব এসআরওতে বেতন নির্ধারণ (ফিক্সেশন), ভাতা, পেনশন ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা বাস্তবায়নের বিস্তারিত বিধান থাকবে।
সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতন
জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুযায়ী বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল থাকছে। ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা। আর প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
নতুন কাঠামোয় প্রথম থেকে ১১তম গ্রেড পর্যন্ত মূল বেতন দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ২০তম গ্রেডে মূল বেতন বাড়বে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের অনুপাতও কমিয়ে ১:১.৭৮ করা হয়েছে।
নতুন কাঠামোয় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে সব গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের জন্য মোবাইল ভাতার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
ধাপে ধাপে বাড়বে পেনশন
নতুন পে-স্কেলের প্রভাব পড়বে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশনেও। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নিট পেনশনপ্রাপ্তদের জন্য বিভিন্ন স্তরে বৃদ্ধির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
মাসে ৯ হাজার টাকা বা তার কম নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের পেনশন ১০০ শতাংশ, ৯ হাজার ১ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৭৫ শতাংশ, ২০ হাজার ১ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার ১ টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ৫৫ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত রয়েছে।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সামরিক ও অসামরিক ক্ষেত্রে ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ ব্যবস্থা ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রয়োজনীয় তথ্যের ঘাটতি ও বিপুল আর্থিক সংশ্লেষের কারণে এটি একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না।
দুই অর্থবছরে ধাপে বাস্তবায়ন
নতুন পে-স্কেল একবারে পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হবে না। ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ধাপে ধাপে এটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
১ জুলাই ২০২৬ থেকে ১ জুলাই ২০২৭-এর মধ্যে মূল বেতন মোট তিন ধাপে কার্যকর হবে। বিভিন্ন ভাতা ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে একযোগে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। স্বল্প আয়ের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দিয়ে দশম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।
গেজেটের অপেক্ষা
নতুন পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের সঙ্গে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন পুনর্নির্ধারণ, বেতন ফিক্সেশন এবং বকেয়া পাওনা সমন্বয়ের প্রক্রিয়া শুরু করার পথ খুলবে। একই সঙ্গে পেনশনভোগীদের তথ্য হালনাগাদ ও নতুন কাঠামো অনুযায়ী পেনশন পুনর্নির্ধারণের কাজও এগিয়ে নেওয়া যাবে।
সরকারের হিসাবে, নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা পাবেন প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী। এতে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।
kalprakash.com/IM