রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ২১ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ২৩ রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ | রাত ৯:০৬:০৯
শিরোনাম
ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে আবাসিক মাদ্রাসা, শিশুদের নিরাপত্তার দায় কার? মাদক মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কে এই সারা খলিফা? চলতি সেপ্টেম্বরেই ইউপি নির্বাচনের তফসিল, ভোট হবে ধাপে ধাপে: ইসি আনোয়ারুল ফ্যাটি লিভার কি সন্তান ধারণে প্রভাব ফেলে? জেনে নিন চিকিৎসকদের পরামর্শ যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কৃত অভিবাসীদের সাময়িক আশ্রয় দিতে সম্মত দক্ষিণ আমেরিকার দেশ গায়ানা ডেঙ্গু বিস্তার রোধে দেশজুড়ে পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কচুয়ায় একই পরিবারের ৩ জনকে হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন, গ্রেপ্তার ৩ নড়াইলে ৬ মাদ্রাসাছাত্রকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে শিক্ষক গ্রেপ্তার বাদশার সঙ্গে বিচ্ছেদ নিয়ে মুখ খুললেন ইশা রিখী রাষ্ট্রায়ত্ত ৬ ব্যাংকে খেলাপি ঋণ পৌনে দেড় লাখ কোটি টাকা, শীর্ষে জনতা: অর্থমন্ত্রী ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে আবাসিক মাদ্রাসা, শিশুদের নিরাপত্তার দায় কার? মাদক মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কে এই সারা খলিফা? চলতি সেপ্টেম্বরেই ইউপি নির্বাচনের তফসিল, ভোট হবে ধাপে ধাপে: ইসি আনোয়ারুল ফ্যাটি লিভার কি সন্তান ধারণে প্রভাব ফেলে? জেনে নিন চিকিৎসকদের পরামর্শ যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কৃত অভিবাসীদের সাময়িক আশ্রয় দিতে সম্মত দক্ষিণ আমেরিকার দেশ গায়ানা ডেঙ্গু বিস্তার রোধে দেশজুড়ে পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কচুয়ায় একই পরিবারের ৩ জনকে হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন, গ্রেপ্তার ৩ নড়াইলে ৬ মাদ্রাসাছাত্রকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে শিক্ষক গ্রেপ্তার বাদশার সঙ্গে বিচ্ছেদ নিয়ে মুখ খুললেন ইশা রিখী রাষ্ট্রায়ত্ত ৬ ব্যাংকে খেলাপি ঋণ পৌনে দেড় লাখ কোটি টাকা, শীর্ষে জনতা: অর্থমন্ত্রী

নজরদারি, নিরাপত্তা ও জবাবদিহি নিয়ে বড় প্রশ্ন

ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে আবাসিক মাদ্রাসা, শিশুদের নিরাপত্তার দায় কার?

আজিজুল ইসলাম যুবরাজ
প্রকাশ: রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:৩৫
শেয়ার: mail
ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে আবাসিক মাদ্রাসা, শিশুদের নিরাপত্তার দায় কার?

কাল প্রকাশ। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে অসংখ্য কওমি মাদ্রাসা। বিশেষ করে আবাসিক ও ছোট পরিসরের অনেক কওমি মাদ্রাসা কোথায়, কীভাবে এবং কতটা নিরাপদ পরিবেশে পরিচালিত হচ্ছে—তা নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। একটি ছোট্ট রুম বা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে শুরু করে দেওয়া হচ্ছে মাদ্রাসার কার্যক্রম। সেখানে শিশু ভর্তি হচ্ছে, আবাসিক থাকছে, রাত কাটাচ্ছে। কিন্তু সেখানে কতটা নিশ্চিত শিশুদের নিরাপত্তা? শিক্ষক বা কর্মচারীদের যোগ্যতা ও পরিচয় আদৌ যাচাই করা হয়েছে কি না? ভবনটি শিশুদের আবাসিক ব্যবহারের উপযোগী কি না? অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি বহির্গমন, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস কিংবা স্বাস্থ্যকর পরিবেশের ব্যবস্থা আছে কি না?
এতই ঠুনকো নাকি শিশুদের জীবন!

অবশ্যই দ্বীনি শিক্ষার প্রয়োজন আছে। কওমি মাদ্রাসা থেকে শিক্ষা নিয়ে বহু শিক্ষার্থী কুরআন-হাদিস, ফিকহ, ইসলামী দর্শন ও ধর্মীয় জ্ঞানে পারদর্শী হয়ে হাফেজ, মাওলানা, মুফতি, মুহাদ্দিস ও মুফাসসিরের মতো বিজ্ঞ আলেম হিসেবে গড়ে উঠছেন। দেশের মসজিদ, মাদ্রাসা, ধর্মীয় শিক্ষা, গবেষণা ও সামাজিক পরিমণ্ডলে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। একজন শিক্ষার্থী দীর্ঘ সময় মাদ্রাসায় পড়ে যেমন ধর্মীয় জ্ঞানে সমৃদ্ধ হতে পারেন, তেমনি একজন নৈতিক, দায়িত্বশীল ও মানবিক মানুষ হিসেবেও গড়ে উঠতে পারেন। তাই কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা কিংবা দ্বীনি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই।

প্রশ্নটা বরং কওমি মাদ্রাসার নামে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মান, নিরাপত্তা ও জবাবদিহি নিয়ে। কারণ দ্বীনি শিক্ষার উদ্দেশ্যই যেখানে জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠা করা, সেখানে কোনো শিশুর নিরাপত্তা যদি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, সেটি কোনোভাবেই স্বাভাবিক বিষয় হতে পারে না।

একটি শিশুকে যখন তার বাবা-মা কোনো কওমি মাদ্রাসায় ভর্তি করান, তখন শুধু পড়াশোনার দায়িত্বই নয়, প্রতিষ্ঠানটির ওপর অর্পিত হয় তার নিরাপত্তার দায়িত্বও। বিশেষ করে আবাসিক মাদ্রাসায় থাকা শিশুর দিনের বড় একটি সময় কাটে পরিবার থেকে দূরে, শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে। ফলে সেখানে দায়িত্বশীল প্রাপ্তবয়স্কদের আচরণ, তদারকি এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তাহলে প্রশ্ন হলো, একটি কওমি মাদ্রাসা চালুর আগে সেখানে শিশুদের থাকার উপযোগী পরিবেশ আছে কি না, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস আছে কি না, জরুরি বহির্গমনের ব্যবস্থা আছে কি না, অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে কি না, শিক্ষক-কর্মচারীদের পরিচয় ও পূর্ববর্তী কর্মকাণ্ড যাচাই করা হয়েছে কি না—এসব দেখার দায়িত্ব কার?

দেশে ঠিক কতগুলো কওমি মাদ্রাসা রয়েছে? এর মধ্যে কতগুলো আবাসিক? কত শিশু সেখানে থাকে? কতজন শিক্ষক ও কর্মচারী দায়িত্ব পালন করেন? কোন কোন প্রতিষ্ঠান কোথায় পরিচালিত হচ্ছে—এর একটি নির্ভরযোগ্য, হালনাগাদ ও কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার কি আমাদের আছে?

আইন ও নীতিমালা থাকলেও শুধু কাগজে তা থাকা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বাস্তব তদারকি, পরিদর্শন ও জবাবদিহি। কোনো প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো বা আবাসিক ব্যবস্থাপনা শিশুদের জন্য অনিরাপদ হলে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া কী? কোনো শিক্ষক বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তার তদন্তই বা কীভাবে হবে?

সাম্প্রতিক সাভারের ঘটনাটি এসব প্রশ্নকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে। সাভারে একটি কওমি মাদ্রাসার আবাসিক সাত বছর বয়সী শিশুকে প্রায় ছয় মাস ধরে একাধিক ছাত্র ও শিক্ষকের দ্বারা যৌন নির্যাতনের অভিযোগ সামনে এসেছে। এ ঘটনায় পাঁচ শিক্ষার্থী ও পাঁচ শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, শিশুটিকে প্রথমে কয়েকজন ছাত্র যৌন নির্যাতন করে এবং পরে একজন শিক্ষকও তাকে ধর্ষণ করেন। অভিযোগ পাওয়ার পরও কয়েকজন শিক্ষক বিষয়টি যথাযথভাবে আমলে নেননি—এমন অভিযোগও রয়েছে।

একটি সাত বছরের শিশুর ক্ষেত্রে যদি এমন অভিযোগ সত্য হয়ে থাকে, তাহলে ঘটনাটি শুধু অভিযুক্ত ব্যক্তিদের অপরাধের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না; প্রতিষ্ঠানের ভেতরে শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ ও কার্যকর নজরদারি ছিল কি না, সেই প্রশ্নও সামনে আসে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো—কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের মধ্যে মোট কতজন যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণের শিকার হয়েছে, তার কোনো নির্ভরযোগ্য জাতীয় পরিসংখ্যান আমাদের হাতে নেই। ফলে সমস্যার প্রকৃত ব্যাপ্তি কতটা, সেটিও স্পষ্ট নয়।

তাহলে প্রশ্নটা আরও বড় হয়ে দাঁড়ায়—যেখানে সমস্যার প্রকৃত চিত্রই আমাদের জানা নেই, সেখানে প্রতিরোধের কার্যকর ব্যবস্থা নেব কীভাবে?

শিশু নির্যাতনের কোনো ঘটনা সামনে আসার পর মামলা, তদন্ত ও বিচারের পাশাপাশি প্রয়োজন প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি চিহ্নিত করা। একটি ঘটনার পর আরেকটি ঘটনা সামনে আসতেই থাকলে এবং প্রতিবারই বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এলে বুঝতে হবে, কোথাও না কোথাও প্রতিরোধব্যবস্থায় ঘাটতি রয়েছে।

আর নারী শিক্ষার্থীদের আবাসিক কওমি মাদ্রাসার ক্ষেত্রে প্রশ্নটি আরও স্পর্শকাতর। কারণ সেখানে কিশোরী ও অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েরা পরিবার থেকে দূরে থেকে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত অবস্থান করে। তাদের নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, স্বাস্থ্য, স্যানিটেশন, আবাসিক ব্যবস্থাপনা এবং অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা কতটা কার্যকর—সেটিও জানা জরুরি।

একটি ছাত্রী মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার পর তার থাকার কক্ষ কেমন, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস আছে কি না, জরুরি পরিস্থিতিতে বের হওয়ার ব্যবস্থা আছে কি না, অসুস্থ হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা কী, নারী শিক্ষার্থীকে দেখভালের জন্য পর্যাপ্ত নারী শিক্ষক বা তত্ত্বাবধায়ক আছেন কি না—এসব প্রশ্ন কি নিয়মিতভাবে তদারক করা হয়?

আর একটি প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই—মহিলা বা কিশোরীদের আবাসিক কওমি মাদ্রাসায় পুরুষ শিক্ষক বা কর্মচারীদের ভূমিকা কতটা প্রয়োজনীয়, আর সেখানে নিরাপত্তার সীমারেখাই বা কীভাবে নির্ধারিত?

একজন পুরুষ শিক্ষক বা কর্মচারী কেন মেয়েদের আবাসিক কক্ষে যাবেন? কোন পরিস্থিতিতে যেতে পারবেন? রাতে কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দায়িত্ব পালন করবেন কে? শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত সমস্যা বা শারীরিক অসুস্থতার ক্ষেত্রে তার সঙ্গে কথা বলবেন কে? অভিযোগ উঠলে তদন্ত করবে কে?

এসব প্রশ্ন কোনো ব্যক্তির চরিত্র নিয়ে নয়; প্রশ্নটি একটি নিরাপদ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার। একজন শিক্ষক ভালো মানুষ হতে পারেন, সৎ হতে পারেন, দায়িত্বশীলও হতে পারেন। কিন্তু শিশু সুরক্ষার নীতিমালা ব্যক্তির ভালো-মন্দ ধারণার ওপর দাঁড়াতে পারে না। একটি নিরাপদ ব্যবস্থা এমন হতে হবে, যেখানে কোনো শিক্ষক বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার সুযোগ কমে এবং অভিযোগ উঠলে দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা যায়।

বিশেষ করে আবাসিক কিশোরীদের ক্ষেত্রে নারী শিক্ষক, তত্ত্বাবধায়ক ও দায়িত্বশীল নারী কর্মীর পর্যাপ্ত উপস্থিতি নিশ্চিত করা, পুরুষ কর্মীদের প্রবেশ ও দায়িত্বের স্পষ্ট সীমা নির্ধারণ করা এবং আবাসিক এলাকায় কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা রাখা—এসব কি বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত নয়?

পরিবারের চোখের আড়ালে থাকা একটি কিশোরী যদি কোনো শিক্ষক বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে চায়, সে অভিযোগ করবে কার কাছে?

যে প্রতিষ্ঠানে অভিযোগের পরিণতি নিয়ে ভয় থাকে, সেখানে একটি কিশোরী মুখ খুলবে কীভাবে?

আর পরিবার যদি ধরে নেয়—‘মেয়েকে তো ধর্মীয় শিক্ষার জন্য নিরাপদ জায়গাতেই পাঠিয়েছি’, সেই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে যদি কোনো অনিয়ম ঘটে, তাহলে দায় নেবে কে?

পুরুষ শিক্ষার্থীদের আবাসিক কওমি মাদ্রাসার নিরাপত্তা নিয়েই যখন প্রশ্ন রয়েছে, নারী শিক্ষার্থীদের আবাসিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে তো আরও কঠোর নিরাপত্তা ও জবাবদিহি প্রয়োজন।

কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কত? কোথায় কোথায় রয়েছে? কতজন ছাত্রী আবাসিক থাকে? কারা তাদের দেখভাল করেন? কতজন নারী শিক্ষক ও তত্ত্বাবধায়ক রয়েছেন? এসব প্রতিষ্ঠানে শিশু ও কিশোরীদের সুরক্ষায় কী ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে? নিয়মিত কোনো পরিদর্শন হয় কি?

যদি এসবের নির্ভরযোগ্য তথ্যই না থাকে, তাহলে এত বড় একটি আবাসিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে আমরা আসলে কোন ভিত্তিতে নিরাপদ বলছি?

শুধু ‘মাদ্রাসা’ নামের ওপর ভরসা করে একটি শিশুকে বা কিশোরীকে নিরাপদ ধরে নেওয়া যায় না। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয় ব্যবস্থা দিয়ে, নিয়ম দিয়ে, নজরদারি দিয়ে এবং জবাবদিহির মাধ্যমে।

আর এখানেই এসে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সামনে আসে—বাংলাদেশের তথাকথিত আলেম সমাজ কোথায়?

শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠছে, আবাসিক মাদ্রাসার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে—কিন্তু এসব বিষয়ে দেশের আলেম সমাজের বড় একটি অংশের কণ্ঠস্বর এতটা ক্ষীণ কেন?

তারা ওয়াজ করেন, বক্তৃতা করেন, নৈতিকতার কথা বলেন, সমাজে শুদ্ধতার কথা বলেন। কিন্তু একটি শিশু যখন মাদ্রাসার ভেতরে নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ তোলে, তখন সেই শিশুর পক্ষে জোরালোভাবে কথা বলতে তাদের কণ্ঠ কোথায় হারিয়ে যায়?

একজন শিশুকে নির্যাতন করা হলে তার প্রতিবাদ করা কি দ্বীনি দায়িত্বের অংশ নয়? একজন শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি তোলা কি ইসলামী ন্যায়বিচারের পরিপন্থী?

বরং এখানে আলেম সমাজেরই সবার আগে বলা উচিত—অভিযুক্ত ব্যক্তি শিক্ষক হলেও তদন্ত হোক, মাদ্রাসা হলেও আইন প্রয়োগ হোক, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হলেও জবাবদিহির বাইরে কেউ নয়।

কোনো অপরাধীকে শুধু তার পরিচয়ের কারণে আড়াল করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। শিক্ষক হলে তাকে শিক্ষক পরিচয়ে ছাড় দেওয়া যাবে না, আর প্রতিষ্ঠানটি ধর্মীয় হলেই তার বিরুদ্ধে অভিযোগকে চাপা দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়।

বরং একটি মাদ্রাসার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সত্য উদঘাটনের দাবি সবচেয়ে জোরালোভাবে আসা উচিত সেই আলেম সমাজের কাছ থেকেই। কারণ কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার নামে একটি শিশুর অভিযোগ চাপা পড়ে গেলে সেই সুনাম আসলে কিসের?

কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘মাদ্রাসার বদনাম হবে’, ‘দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে’—এই চিন্তা যদি সত্য উদঘাটনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে প্রশ্ন হলো—একটি শিশুর জীবন, নিরাপত্তা ও মর্যাদার চেয়ে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি কি বড়?
না, হতে পারে না।

কওমি মাদ্রাসা মানেই অনিয়ম—এ কথা যেমন সত্য নয়, তেমনি ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হওয়ায় কোনো প্রতিষ্ঠান আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে—এটিও গ্রহণযোগ্য নয়। বরং যারা সত্যিকার অর্থে দ্বীনি শিক্ষা ও আলেম তৈরির এই ধারাকে এগিয়ে নিতে চান, তাদেরই সবার আগে দাবি তোলা উচিত—প্রতিটি কওমি মাদ্রাসা হোক নিরাপদ, সুশৃঙ্খল, জবাবদিহিমূলক ও শিক্ষার উপযোগী।

একজন বিজ্ঞ আলেম তৈরির প্রক্রিয়া শুধু বই পড়ানো বা ধর্মীয় জ্ঞান দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন শিক্ষার্থীর চরিত্র, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও মানুষের প্রতি সম্মানবোধও গড়ে তুলতে হয়। যে পরিবেশে একজন শিশু ভবিষ্যতের আলেম হওয়ার শিক্ষা নেবে, সেই পরিবেশে তার নিজের নিরাপত্তা ও মর্যাদাই যদি নিশ্চিত না থাকে, তাহলে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

প্রয়োজন কওমি মাদ্রাসাগুলোকে হয়রানি করা নয়; প্রয়োজন কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির আওতায় আনা। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের অবস্থান ও কার্যক্রমের নির্ভরযোগ্য তথ্য সংরক্ষণ, শিক্ষক-কর্মচারীদের যথাযথ যাচাই, আবাসিক ব্যবস্থাপনার নিরাপত্তা, ভবনের অগ্নি ও জরুরি নিরাপত্তা ব্যবস্থা, শিশু সুরক্ষা নীতিমালা এবং অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, অভিযোগ জানানোর এমন ব্যবস্থা থাকতে হবে যেখানে একটি শিশু বা তার অভিভাবক কোনো ভয় বা চাপ ছাড়াই অভিযোগ করতে পারেন। কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির সুনাম রক্ষার জন্য শিশুর অভিযোগ চাপা দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়।

আর আলেম সমাজের দায়িত্বও এখানেই। তারা যদি সত্যিই নৈতিকতা, মানবিকতা ও ন্যায়বিচারের কথা বলেন, তাহলে শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে তাদের কণ্ঠ সবচেয়ে জোরালো হওয়া উচিত। মাদ্রাসার ভেতরের অন্যায়কে আড়াল করা নয়, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েই দ্বীনি শিক্ষার মর্যাদা রক্ষা করতে হবে।

নীরবতা কখনো নিরপেক্ষতা নয়। কোনো শিশুর কান্নার সময় নীরব থাকা সমস্যাকে টিকিয়ে রাখার সুযোগ করে দিতে পারে।

আমরা চাই দেশে কওমি মাদ্রাসা থাকুক, দ্বীনি শিক্ষা আরও বিস্তৃত হোক, মাদ্রাসা থেকে আরও যোগ্য ও বিজ্ঞ আলেম তৈরি হোন। কিন্তু সেই শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা তখনই আরও শক্ত হবে, যখন প্রতিটি অভিভাবক নিশ্চিন্তে বলতে পারবেন—আমার সন্তান সেখানে শুধু শিক্ষা পাবে না, নিরাপদও থাকবে।

শিশু সবার আগে। তার নিরাপত্তার কোনো বিকল্প নেই।

দ্বীনি শিক্ষা চলুক, কওমি মাদ্রাসা চলুক, আরও যোগ্য ও বিজ্ঞ আলেম তৈরি হোক—কিন্তু শিশুর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও আইনের শাসনের বিনিময়ে নয়।

এতই ঠুনকো নাকি শিশুদের জীবন?

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সব দেখুন arrow_forward
Logo
রোববার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | Globe kalprakash.com

ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে আবাসিক মাদ্রাসা, শিশুদের নিরাপত্তার দায় কার?

বিস্তারিত কমেন্টে